নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪
০১ জুলাই, ২০২৬ |
মহাকাশ কিংবা চাঁদের পৃষ্ঠ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। আমরা প্রতিনিয়ত কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের মঙ্গল গ্রহ কিংবা ব্ল্যাক হোল নিয়ে গবেষণা করছি। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমাদের নিজেদের গ্রহের বুকেই এমন এক স্থান রয়েছে যা মহাকাশের চেয়েও বেশি রহস্যময় এবং দুর্গম? সেটি হলো পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর তলদেশ। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ এলাকা আজও মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অন্ধকার ও অনাবিষ্কৃত। আর এই অনাবিষ্কৃত জলসাম্রাজ্যের সবচেয়ে রহস্যময় ও হাড়হিম করা জায়গাটির নাম হলো ‘মারিয়ানা ট্রাঞ্চ’ (Mariana Trench), যার গভীরতম বিন্দুর নাম ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’।যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, যেখানে পানির চাপ কোনো সাধারণ বস্তুকে মুহূর্তে দুমড়ে-মুচড়ে পিষে ফেলতে পারে—সেই চিরঅন্ধকার নরকসদৃশ পরিবেশে কীভাবে টিকে আছে অদ্ভুত সব জাদুকরী প্রাণী? আজ পাবনা নিউজ ২৪-এর এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আমরা মারিয়ানা ট্রাঞ্চের গভীরতম রহস্যের দেয়াল উন্মোচন করব।
মারিয়ানা ট্রাঞ্চ কী এবং এটি কোথায় অবস্থিত?
মারিয়ানা ট্রাঞ্চ হলো মূলত পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত একটি বিশাল সামুদ্রিক গিরিখাত বা পরিখা। এটি ফিলিপাইনের পূর্ব দিকে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি অবস্থিত। ভূ-তাত্ত্বিক প্লেটের (Tectonic Plates) সংঘর্ষের ফলে সমুদ্রের তলদেশে এই অবিশ্বাস্য গভীর খাতের সৃষ্টি হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২,৫৫Layout কিলোমিটার এবং প্রস্থ মাত্র ৬৯ কিলোমিটার। এর আকৃতি অনেকটা অর্ধচন্দ্রের মতো।
চ্যালেঞ্জার ডিপ: মাউন্ট এভারেস্টের চেয়েও গভীর!
মারিয়ানা ট্রাঞ্চের একদম শেষ প্রান্ত বা গভীরতম বিন্দুটিকে বলা হয় ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’। এর গভীরতা প্রায় ১১,০০০ মিটার বা প্রায় ৩৬,০০০ ফুট। এই গভীরতার ভয়াবহতা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে।সহজ কথায় তুলনা করলে, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ (উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার)-কে যদি উপড়ে এনে এই চ্যালেঞ্জার ডিপের ভেতর ডুবিয়ে দেওয়া হয়, তাহলেও এভারেস্টের চূড়া সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আরও প্রায় ২ কিলোমিটার বা ২০০০ মিটার নিচে থাকবে! অর্থাৎ, গোটা এভারেস্ট পর্বতকে গিলে খেয়ে ফেলার পরও এর ওপর বিশাল সমুদ্রের পানি থৈ থৈ করবে।
মারিয়ানা ট্রাঞ্চের মূল রহস্য ও চরম পরিবেশ
চ্যালেঞ্জার ডিপে পৃথিবীর অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে পরিবেশ সবচেয়ে বেশি প্রতিকূল। এখানকার ৩টি মূল বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের আজও ভাবিয়ে তোলে:
১. দানবীয় পানির চাপ (Crushing Pressure)
সমুদ্রের নিচে প্রতি ১০ মিটার গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে পানির চাপ এক বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (Atmospheric Pressure) করে বাড়তে থাকে। চ্যালেঞ্জার ডিপের তলদেশে পানির চাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে প্রায় ১,০০০ গুণেরও বেশি। সেখানে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে চাপের পরিমাণ প্রায় ৮ টন! এটি ঠিক এমন, যেন আপনার বুড়ো আঙুলের ওপর এক নিমিষে আস্ত একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান বা ৫০টি বড় হাতিকে চড়িয়ে দেওয়া হলো। এই তীব্র চাপের কারণে সাধারণ যেকোনো সাবমেরিন বা ডুবোযান সেখানে যাওয়া মাত্রই লোহার ক্যানের মতো তুবড়ে ভেঙে যাবে।
২. চিরস্থায়ী অন্ধকার ও হিমশীতল তাপমাত্রা
সমুদ্রের পানির নিচে সাধারণত ১,০০০ মিটারের (৩,২৮০ ফুট) পর সূর্যের আলো আর বিন্দুমাত্র পৌঁছাতে পারে না। ফলে মারিয়ানা ট্রাঞ্চের পুরো ১১ কিলোমিটার এলাকাই ঘুটঘুটে, নিরেট অন্ধকারে ঢাকা। সেখানে দিন বা রাতের কোনো পার্থক্য নেই। আলো না থাকায় এখানকার তাপমাত্রা মাত্র ১ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস (হিমাঙ্কের ঠিক ওপরে)। তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, এর কিছু কিছু জায়গায় হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা ভূ-গর্ভস্থ আগ্নেয়গিরির মুখ রয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ৪৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ফুটন্ত খনিজ পানি বের হয়।
এই নরককুণ্ডে কারা বাস করে? মারিয়ানার অদ্ভুত প্রাণীকুল
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন মনে করতেন যে, এত চাপ আর অন্ধকারে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা অসম্ভব। কিন্তু অতি-আধুনিক প্রযুক্তির রোবোটিক সাবমেরিন পাঠিয়ে সেখানে যা দেখা গেছে, তা বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে। সেখানে এমন কিছু অদ্ভুত ও ভয়ানক আকৃতির অমেরুদণ্ডী প্রাণী এবং মাছ বাস করে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না:
অ্যাম্ফিপড (Giant Amphipods): গভীর সমুদ্রে থাকা এই চিংড়িজাতীয় প্রাণীগুলো আকারে সাধারণের চেয়ে অনেক বড় হয়। তীব্র পানির চাপে যেখানে হাড় বা কঙ্কাল ভেঙে যাওয়ার কথা, সেখানে এদের শরীরে এক ধরণের বিশেষ রাসায়নিক উপাদান থাকে যা এদের কোষ ও চামড়াকে তরল ও নমনীয় রাখে।
অ্যাঙ্গলার ফিশ (Anglerfish): ঘুটঘুটে অন্ধকারে শিকার ধরার জন্য এই মাছের মাথায় একটি প্রাকৃতিক টর্চ বা আলোর উৎস থাকে। তাদের শরীরে থাকা এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো ছড়ায় (Bioluminescence), যা দেখে অন্য ছোট মাছেরা আকৃষ্ট হলে এরা তাদের ধারালো দাঁত দিয়ে গিলে ফেলে।
ঘোস্ট ফিশ বা স্নেইলফিশ (Mariana Snailfish): চ্যালেঞ্জার ডিপের প্রায় ৮,০০০ মিটার নিচে এই মাছটির সন্ধান মিলেছে। এদের শরীর পুরোপুরি স্বচ্ছ বা জেলিফিশের মতো নরম। এদের ভেতরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। হাড় না থাকার কারণেই এরা এই দানবীয় চাপ সহ্য করতে পারে।
জম্বি ওয়ার্ম এবং জেলিফিশ: মারিয়ানা ট্রাঞ্চের তলদেশে এমন কিছু জেলিফিশের দেখা মিলেছে, যা দেখতে অবাস্তব এলিয়েনের মতো রঙিন আলো ছড়ায়। এছাড়াও মৃত তিমির হাড় খেয়ে বেঁচে থাকা জম্বি ওয়ার্মের মতো অণুজীবের সন্ধান এখানে পাওয়া গেছে।মারিয়ানা ট্রাঞ্চ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির রহস্য মানুষের জানার পরিধির চেয়ে কত বেশি বিশাল। মহাকাশ জয়ের নেশায় মত্ত মানুষ আজও নিজের গ্রহের এই অতল তলদেশকে পুরোপুরি জয় করতে পারেনি। তবে বিজ্ঞানীদের আশা, ২০২৬ সালের এই আধুনিক সাবমেরিন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগে হয়তো খুব দ্রুতই চ্যালেঞ্জার ডিপের নিখুঁত মানচিত্র ও এর ভেতরের আরও বড় কোনো রহস্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে।