ডেস্ক রিপোর্ট, পাবনা নিউজ ২৪:
জন্ম ও মৃত্যু চিরন্তন সত্য। একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া জমি-জমা, বাড়ি-গাড়ি বা ব্যাংকে জমানো টাকার উত্তরাধিকারী কারা হবেন—তা নিয়ে আমাদের সমাজ ও আইনে স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আপনার মৃত্যুর পর আপনার ফেসবুক প্রোফাইল, পার্সোনাল জিমেইল ইনবক্স, ইউটিউব চ্যানেল, ক্লাউড স্টোরেজে থাকা হাজারো ব্যক্তিগত ছবি কিংবা ডিজিটাল ওয়ালেটে থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সির কী হবে?আমরা প্রতিদিন ইন্টারনেটে যে বিশাল ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ বা তথ্যের ছাপ রেখে যাচ্ছি, আমাদের মৃত্যুর পর সেগুলো এক অদ্ভুত শূন্যতায় পর্যবসিত হয়। প্রযুক্তির পরিভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘ডিজিটাল ডেথ’ বা ডিজিটাল মৃত্যু। ২০২৬ সালের এই হাইপার-ডিজিটাল যুগে এসে বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—মৃত্যুর পর একজন মানুষের এই ভার্চুয়াল সম্পত্তির মালিকানা আসলে কার? প্রযুক্তি জায়ান্টদের এই সংক্রান্ত আইন কী এবং কীভাবে আপনি বেঁচে থাকতেই আপনার ‘ডিজিটাল উইল’ বা উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করে যেতে পারেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক এই অজানা দুনিয়ার আদ্যোপান্ত।
মৃত্যুর পর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ভবিষ্যৎ
মেটা (Meta)-র বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যবহারকারীর মৃত্যুর পর তার অ্যাকাউন্টটি চিরতরে ডিলিট বা মুছে ফেলা যায়, অথবা সেটিকে ‘মেমোরিয়ালাইজড’ (Memorialized) বা স্মরণীয় অ্যাকাউন্টে রূপান্তর করা যায়।
যদি কোনো অ্যাকাউন্ট মেমোরিয়ালাইজড করা হয়, তবে প্রোফাইলে নামের পাশে ‘Remembering’ বা ‘স্মরণে’ শব্দটি যুক্ত হয়। সেখানে বন্ধুরা এসে স্মৃতিচারণ করতে পারেন, কিন্তু কেউ সেই অ্যাকাউন্টে লগইন করতে পারেন না বা নতুন কোনো পোস্ট দিতে পারেন না। তবে মেটা এই সিদ্ধান্ত নিজে থেকে নেয় না; এর জন্য ব্যবহারকারীকে বেঁচে থাকতেই একজন ‘লিগ্যাসি কন্ট্যাক্ট’ (Legacy Contact) বা ডিজিটাল উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যেতে হয়।
জিমেইল, ড্রাইভ এবং গুগলের ‘ইনঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার’
আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল তথ্যগুলো থাকে গুগল অ্যাকাউন্টে (যেমন: জিমেইল, গুগল ফটোজ, ড্রাইভ বা ইউটিউব চ্যানেল)। গুগলের একটি চমৎকার ফিচার রয়েছে, যার নাম ‘ইনঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার’ (Inactive Account Manager)।এই ফিচারের মাধ্যমে আপনি গুগলকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (যেমন: ৩ মাস, ৬ মাস বা ১ বছর) নির্ধারণ করে দিতে পারেন। আপনি যদি সেই সময়ের মধ্যে আপনার অ্যাকাউন্টে কোনো লগইন না করেন, তবে গুগল ধরে নেবে আপনি আর এই পৃথিবীতে নেই বা অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করছেন না। এরপর গুগল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার পূর্বনির্ধারিত বিশ্বস্ত কোনো বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের কাছে একটি লিঙ্ক পাঠিয়ে দেবে, যেখান থেকে তারা আপনার নির্দিষ্ট কিছু ডেটা ডাউনলোড করতে পারবেন। অথবা আপনি চাইলে আপনার অ্যাকাউন্টটি সম্পূর্ণ ডিলিট করে দেওয়ার নির্দেশও সেট করে রাখতে পারেন।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল ওয়ালেট: সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট হাতছাড়া হলে হয়তো আবেগঘন ক্ষতি হয়, কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি (যেমন: বিটকয়েন, ইথেরিয়াম) বা ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে এটি সরাসরি আর্থিক ক্ষতি। ব্লকচেইন প্রযুক্তির বিকেন্দ্রীকরণ নিয়মের কারণে, আপনি যদি আপনার ওয়ালেটের ‘প্রাইভেট কি’ (Private Key) বা পাসওয়ার্ড কাউকে না জানিয়ে মারা যান, তবে সেই ডিজিটাল অর্থ পৃথিবীর কোনো শক্তির পক্ষেই উদ্ধার করা সম্ভব নয়। প্রতি বছর কোটি কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি স্রেফ মালিকের মৃত্যুর কারণে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই আধুনিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এখন ডিজিটাল সম্পদের জন্য ‘ডিজিটাল উইল’ বা আইনি অসিয়তনামার ওপর জোর দিচ্ছেন।
কীভাবে সেট করবেন আপনার ‘ডিজিটাল উইল’?
আপনার মৃত্যুর পর আপনার অনলাইন জীবনের নিয়ন্ত্রণ যাতে ভুল মানুষের হাতে না পড়ে বা আপনার ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য আজই নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত:
১. ফেসবুক লিগ্যাসি কন্ট্যাক্ট: ফেসবুকের Settings > Personal Details > Account Ownership and Control > Memorialization-এ গিয়ে আপনার পরিবারের কোনো বিশ্বস্ত সদস্যকে লিগ্যাসি কন্ট্যাক্ট হিসেবে সিলেক্ট করুন।
২. গুগল ইনঅ্যাক্টিভ ম্যানেজার: গুগলে ‘Inactive Account Manager’ সার্চ করে সেখানে আপনার অ্যাকাউন্টটি কতদিন নিষ্ক্রিয় থাকলে তা পরিবারের কাছে হ্যান্ডওভার করা হবে এবং কোন কোন ডেটা তারা দেখতে পাবেন, তা সেট করে রাখুন।
৩. পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার: একটি নিরাপদ পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করুন এবং এর ‘মাস্টার কি’ বা প্রধান পাসওয়ার্ডটি একটি ডায়েরিতে বা বিশ্বস্ত আইনজীবীর কাছে লিখে রাখুন, যা আপনার মৃত্যুর পর আপনার পরিবার ব্যবহার করতে পারবে।
আমরা প্রতিনিয়ত বাস্তব জীবনের সম্পত্তি আগলে রাখার জন্য কত কিছুই না করি। কিন্তু আমাদের যে সমান্তরাল একটি অনলাইন জীবন গড়ে উঠেছে, তার সুরক্ষার কথা আমরা অনেকেই ভাবি না। ডিজিটাল ডেথ বা ডিজিটাল লিগ্যাসি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর এখনই সঠিক সময়। আপনার রেখে যাওয়া ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট যেন আপনার মৃত্যুর পর আপনার পরিবারের জন্য কষ্টের কারণ না হয়ে একটি সুন্দর স্মৃতির স্মারক হয়ে থাকে, সেই দায়িত্ব কিন্তু আপনারই।