স্পোর্টস ডেস্ক:পাবনা নিউজ ২৪
ফুটবল যে চরম অনিশ্চয়তা আর রোমাঞ্চের খেলা, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি স্টেডিয়ামে। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর রাউন্ড অফ ৩২-এর এক অতি নাটকীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং টুর্নামেন্টের অন্যতম আন্ডারডগ ও নবাগত আফ্রিকান দেশ কাবো ভের্দে। কাগজের কলমে আলবিসেলেস্তেরা পরিষ্কার ফেবারিট হলেও, মাঠের লড়াইয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের ঘাম ছুটিয়ে ছেড়েছে আফ্রিকার এই পুচকে দ্বীপরাষ্ট্রটি। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ সমতায় থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই শেষে কাবো ভের্দেকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ১৬ বা দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকিট নিশ্চিত করেছে লিওনেল মেসির দল।
মেসির হাত ধরে শুভ সূচনা ও রেকর্ড
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রেখে আক্রমণ শানাতে থাকে। প্রথম থেকেই কাবো ভের্দে রক্ষণভাগ ও তাদের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা (Vozinha) চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যান। মেসির বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত শট ও ফ্রি-কিক অসাধারণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন তিনি। তবে ম্যাচের ২৯তম মিনিটে ডেডলক ভাঙেন জাদুকর লিওনেল মেসি। লিসান্দ্রো মার্তিনেসের একটি নিখুঁত ডায়াগোনাল পাস চমৎকার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ফাঁকি দিয়ে বল জালের ওপরের কোণায় জড়ান মেসি।এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে নিজের ৭ম গোলটি তুলে নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এককভাবে শীর্ষে চলে গেলেন ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি। একই সাথে এটি তার ক্যারিয়ারের ২০তম বিশ্বকাপ গোল, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক অনন্য নতুন মাইলফলক। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায়।
কাবো ভের্দেও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন
দ্বিতীয়ার্ধে ফিরে উল্টো রূপ দেখায় কাবো ভের্দে। ম্যাচের ৫৯তম মিনিটে পুরো মায়ামি স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেয় তারা। রায়ান মেন্দেসের পাস থেকে বল পেয়ে রক্ষণভাগের কড়া পাহারা এড়িয়ে এক কঠিন কোণ থেকে লো শটে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে পরাস্ত করেন ডেরয় দুয়ার্তে (Deroy Duarte)। ১-১ গোলে সমতা ফেরার পর ম্যাচ আরও জমে ওঠে। ৯০ মিনিট পর্যন্ত ভোজিনহার দুর্দান্ত সব সেভ এবং কাবো ভের্দে ডিফেন্সের দৃঢ়তায় কোনো দলই আর গোল করতে পারেনি। ফলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের শ্বাসরুদ্ধকর নাটকীয়তা
অতিরিক্ত সময় শুরু হতেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। ৯২তম মিনিটে মেসির কর্নার থেকে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর হেডের পর বল পান লিসান্দ্রো মার্তিনেস। তিনি ঠাণ্ডা মাথায় বাম পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। আলবিসেলেস্তেরা যখন ভাবছিল ম্যাচ তাদের নিয়ন্ত্রণে, তখনই ফুটবল বিশ্ব দেখল এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোল।১০৩তম মিনিটে কাবো ভের্দে-র সিডনি লোপেস কাব্রাল ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক চোখ ধাঁধানো বাঁকানো শটে বল আর্জেন্টিনার পোস্টের একদম ওপরের কোণায় পাঠিয়ে দেন। গোলরক্ষক ‘দিবু’ মার্তিনেসের উড্ডয়ন সত্ত্বেও বল আটকানো সম্ভব ছিল না। ২-২ সমতায় ম্যাচ তখন টাইব্রেকারের দিকে ধাবিত হচ্ছিল।
রোমেরোর হেড এবং ভাগ্য নির্ধারণী আত্মঘাতী গোল
ম্যাচ যখন পেনাল্টি শুটআউটের রোমাঞ্চের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই ১১১ মিনিটে দৃশ্যপটে হাজির হন আর্জেন্টিনার তারকা ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। লিওনেল মেসির একটি মাপা কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বলে জোরালো হেড করেন রোমেরো। বলটি কাবো ভের্দে-র ডিফেন্ডার দিনেই বোর্হেসের (Diney Borges) গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে গোললাইন অতিক্রম করে। ফিফা অফিসিয়ালি এটিকে আত্মঘাতী গোল হিসেবে ঘোষণা করলেও, এই গোলটিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জয়ের নায়ক বনে যায়। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে কাবো ভের্দে সমতায় ফেরার জোর প্রচেষ্টা চালালেও এমিলিয়ানো মার্তিনেসের একটি দুর্দান্ত সেভ আর্জেন্টিনার ৩-২ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে।
ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও শেষ ১৬-র সমীকরণ
ম্যাচ শেষে কাবো ভের্দে দলের খেলোয়াড়রা কান্নায় ভেঙে পড়লেও গ্যালারির দর্শকদের করতালিতে সিক্ত হন। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নকআউট পর্বে এসে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো পরাশক্তিদের রুখে দেওয়া এই দলটির বিদায় ছিল বীরোচিত। ম্যাচ শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি বলেন,”আমরা জানতাম ম্যাচটি কঠিন হবে। বিশ্বকাপে কেউ আপনাকে সহজে কিছু দেবে না। কাবো ভের্দে অসাধারণ খেলেছে এবং তাদের এই পারফরম্যান্সের জন্য অভিনন্দন প্রাপ্য।”কোচ লিওনেল স্কালোনিও প্রতিপক্ষের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এই জয়ের ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামী মঙ্গলবার আটলান্টায় মিশরের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা, যারা অন্য ম্যাচে টাইব্রেকারে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শেষ ১৬ নিশ্চিত করেছে।