নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪
৪ জুলাই, ২০২৬
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মেটাতে এবং মহামূল্যবান কৃষিজমি নষ্ট না করে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে ২০২৬ সালে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেছে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম জলাশয় কাপ্তাই হ্রদের বুকে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (BPDB) তদারকিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দেশের প্রথম বৃহৎ মাপের ‘ফ্লোটিং সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট’ বা ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। জমি সংকটের এই দেশে পানির ওপর সোলার প্যানেল ভাসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই আধুনিক ‘ফ্লোটোভোল্টাইক’ (Floatovoltaic) প্রযুক্তি আমাদের গ্রিন এনার্জি খাতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। কাপ্তাইয়ের পূর্ববর্তী ৭.৪ মেগাওয়াটের অন-গ্রিড স্থলজ সৌর প্রকল্পের সফলতার পর এই ভাসমান প্রকল্পটিকে দেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
কাপ্তাই হ্রদে ভাসমান সৌরবিদ্যুতের বহুমুখী সুবিধাসমূহ (Benefits)
কাপ্তাই হ্রদের এই বৃহৎ ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি শুধু যে জাতীয় গ্রিডে গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যোগ করছে তা নয়, এর বৈজ্ঞানিক এবং পরিবেশগত সুবিধাগুলো দেশের সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে:
১. জমির সর্বোচ্চ সাশ্রয় ও ফসলি জমি রক্ষা
সাধারণত ১ মেগাওয়াট স্থলজ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রায় সাড়ে ৩ একর ভূমির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যেখানে কৃষিজমি রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে কাপ্তাই হ্রদের বিশাল অব্যবহৃত জলরাশি ব্যবহার করায় কোনো ফসলি জমি বা বনাঞ্চল নষ্ট করতে হচ্ছে না।
২. প্যানেলের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি (Enhanced Efficiency)
স্থলের সোলার প্যানেলগুলো গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বা এফিসিয়েন্সি কমে যায়। তবে ভাসমান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে হ্রদের পানির প্রাকৃতিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার (Cooling Effect) কারণে প্যানেলগুলো প্রচণ্ড গরমেও ঠাণ্ডা থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে এই প্যানেলগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
৩. পানি বাষ্পীভবন রোধ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সহায়তা
শুষ্ক মৌসুমে বা খরার সময় (বিশেষ করে সাম্প্রতিক জুন-জুলাইয়ের তীব্র গরমে) কাপ্তাই হ্রদের পানি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার ফলে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পানির ওপর সোলার প্যানেলের বিশাল আস্তরণ বা শেড থাকার কারণে হ্রদের জল বাষ্পীভূত (Water Evaporation) হতে পারে না। ফলে হ্রদের পানি সংরক্ষিত থাকে, যা শুষ্ক মৌসুমে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিটগুলো সচল রাখতে সরাসরি সাহায্য করে।
৪. মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও ক্ষতিকর শ্যাওলা নিয়ন্ত্রণ
প্যানেলগুলো পানির ওপর ছায়া তৈরি করার ফলে হ্রদের পানিতে অতিরিক্ত ক্ষতিকর শ্যাওলা (Algae Bloom) জন্মাতে পারে না। শ্যাওলার আক্রমণ কম হওয়ায় পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা একদম নিখুঁত থাকে। এটি কাপ্তাই হ্রদের সুস্বাদু কার্প ও অন্যান্য মৎস্যসম্পদের দ্রুত বংশবৃদ্ধি এবং জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এক অদ্ভুত ও চমৎকার ভূমিকা পালন করছে।
৫. বিদ্যমান গ্রিড লাইনের ব্যবহার ও খরচ সাশ্রয়
কাপ্তাইয়ে যেহেতু দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আগে থেকেই অবস্থিত, তাই সেখানে পর্যাপ্ত হাই-ভোল্টেজ ট্রান্সমিশন লাইন এবং সাব-স্টেশন সাবলীলভাবে প্রস্তুত রয়েছে। নতুন এই ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পাঠাতে নতুন কোনো বড় অবকাঠামো তৈরি করতে হয়নি, যা সরকারের কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা
আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মেটানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কাপ্তাই হ্রদের এই পাইলট প্রজেক্টের অভাবনীয় সাফল্য এখন দেশের অন্যান্য বড় জলাশয়, যেমন—বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল, তিস্তা ব্যারেজের সেচ ক্যানেল এবং পরিত্যক্ত খনি হ্রদগুলোতেও একই প্রযুক্তি ব্যবহারের পথ সুগম করে দিয়েছে। কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে এনে বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে এবং ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ এর লক্ষ্য অর্জনে এই গ্রিন এনার্জি প্রকল্প এক যুগান্তকারী মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হচ্ছে।