নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪
প্রশাসনিক প্রচারণায় ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি দূর করতে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে সরকারি কোনো কর্মসূচি বা অনুষ্ঠানের ব্যানার, ফেস্টুন কিংবা বিলবোর্ডে দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) বা অন্য কোনো শৈল্পিক ও বিশেষ আঙ্গিকেও এই ছবি ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।আজ রোববার (৫ জুলাই, ২০২৬) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাধারণ অধিশাখা থেকে জারিকৃত এক বিশেষ পরিপত্রের মাধ্যমে এই নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব তানিয়া আফরোজ স্বাক্ষরিত এই পরিপত্রটি ইতিমধ্যে দেশের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে তা ‘অনতিবিলম্বে’ কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই ইতিবাচক সিদ্ধান্তটি সচেতন নাগরিক সমাজ এবং প্রশাসনিক মহলে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে।
পরিপত্রের মূল নির্দেশনা ও বিষয়বস্তু
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জারি করা এই পরিপত্রে পরিষ্কারভাবে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি প্রচারণামূলক কার্যক্রমকে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক না করে উদ্দেশ্য-কেন্দ্রিক করাই এই নতুন নির্দেশনার মূল লক্ষ্য। পরিপত্রের মূল পয়েন্টগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা: সরকারি কোনো অনুষ্ঠান, সেমিনার বা প্রকল্পের উদ্বোধনের লক্ষ্যে প্রস্তুত করা কোনো ধরনের ব্যানার, ফেস্টুন, ডিজিটাল ডিসপ্লে বা বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আঙ্গিক পরিবর্তনও অবৈধ: শুধু সাধারণ ছবিই নয়, কোনো ধরনের গ্রাফিক্স আর্ট, ইলাস্ট্রেশন, থ্রিডি (৩ডি) মডেলিং বা অন্য কোনো বিশেষ ভিজ্যুয়াল ডিজাইনেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতি বা অবয়ব ফুটিয়ে তোলা যাবে না।
অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তুকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য: প্রচারণামূলক সামগ্রী তৈরির সময় কোনো ব্যক্তি বা নেতার স্তুতি না গেয়ে অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য, জনকল্যাণমূলক বার্তা এবং মূল বিষয়বস্তুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্যের উপস্থাপন: ব্যানারে যত্রতত্র অহেতুক তথ্যের ভিড় না বাড়িয়ে অত্যন্ত মার্জিত এবং সুনির্দিষ্টভাবে প্রয়োজনীয় ও সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। নকশা এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ এক নজরে অনুষ্ঠানের মূল বার্তাটি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে।
কেন এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত অনন্য ও যুগান্তকারী?
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে যেকোনো সরকারি প্রকল্প, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কিংবা সাধারণ প্রচারণায় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা বা সরকারপ্রধানের বিশাল ছবি ব্যবহার করা একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। অনেক সময় দেখা যেত, মূল জনকল্যাণমূলক বার্তার চেয়ে রাজনৈতিক নেতার ছবিই ব্যানারের সিংহভাগ জায়গা জুড়ে থাকত। এই সংস্কৃতির কারণে প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য যেমন ব্যাহত হতো, তেমনি সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হতো কেবল ছবি সংবলিত ব্যানার ও বিলবোর্ড তৈরিতে।বর্তমান সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তটি মূলত একটি ইতিবাচক নীতি পরিবর্তন (Positive Policy Shift)। এর মাধ্যমে প্রচারণা থেকে ‘ব্যক্তিপূজা’ (Personality Cult) কমিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা আসবে এবং প্রশাসনের একটি বড় অংশের মাঝে চামচামি বা তোষামোদির যে প্রবণতা ছিল, তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
প্রশাসনের প্রতি কঠোর বার্তা
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই পরিপত্রটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। মাঠপর্যায়ের জেলা প্রশাসক (ডিসি), বিভাগীয় কমিশনার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) এই নির্দেশনার প্রতি কঠোর নজর রাখার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কার্যালয় বা দপ্তর যদি এই নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো ব্যানার বা ফেস্টুন প্রদর্শন করে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।এই প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। নেটিজেনদের মতে, এটি একটি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করতে এবং অনুষ্ঠানগুলোর মূল জনসেবামূলক বার্তা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকা রাখবে।