স্পোর্টস ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪:
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে লাতিন আমেরিকার লড়াকু দল প্যারাগুয়েকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। ‘রাউন্ড অব ১৬’ বা শেষ ১৬-এর এই হাই-ভোল্টেজ জয়ের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ফরাসিরা। ফিলাডেলফিয়ার লিঙ্কন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ডে অনুষ্ঠিত এই ফুটবল দ্বৈরথের একমাত্র নায়ক ছিলেন ফরাসি অধিনায়ক ও রিয়াল মাদ্রিদের সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপে। তার করা দুর্দান্ত জোড়া গোলের ওপর ভর করেই মূলত উড়তে থাকা প্যারাগুয়ের প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এই জয়ের ফলে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি পুনরুদ্ধারের মিশনে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ‘লেস ব্লুস’রা।
প্রথমার্ধে প্যারাগুয়ের প্রতিরোধ ও ফরাসি আক্রমণ
ম্যাচের শুরু থেকেই গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো ভক্তের চিৎকারে মুখরিত ছিল ফিলাডেলফিয়া। ম্যাচের প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই ফ্রান্স তাদের স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসে। মাঝমাঠে অরেলিয়েন চুয়ামেনি এবং এডুয়ার্ডো কামাভিঙ্গার চমৎকার বোঝাপড়া এবং উইংয়ে উসমান ডেম্বেলের গতি প্রথমার্ধেই প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দেয়। ফ্রান্স ম্যাচের শুরু থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রাখলেও, লাতিন আমেরিকার দলটি রক্ষণে কড়া পাহারা বসিয়েছিল।
বিশেষ করে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক এবং ডিফেন্ডারদের কড়া ট্যাকলিং প্রথমার্ধের বেশ কিছু সময় ফরাসি আক্রমণভাগকে গোলবঞ্চিত রাখতে সক্ষম হয়। কাউন্টার অ্যাটাক বা প্রতি-আক্রমণ থেকে দুই-একবার প্যারাগুয়ের ফরোয়ার্ডরা ফ্রান্সের ডিফেন্সে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করলেও ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মেইগনানকে ফাঁকি দিতে পারেনি। প্রথমার্ধে ফ্রান্সের বেশ কিছু জোরালো শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় ম্যাচটি কিছুটা ধীরগতিতে এগোতে থাকে। তবে বিরতির ঠিক আগের মুহূর্তে ফরাসিদের আক্রমণের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগ শেষ পর্যন্ত খেই হারিয়ে ফেলে।
দ্বিতীয়ার্ধে এমবাপের তাণ্ডব ও ফরাসি আধিপত্য
১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতির পর মাঠে নেমে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা আরও বেশি বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে। দ্বিতীয়ার্ধে তারা শুধুমাত্র পাসিং ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি আক্রমণাত্মক কৌশল বেছে নেয়। খেলার গতি যত বাড়ছিল, ফরাসি স্ট্রাইকার কিলিয়ান এমবাপের চেনা রূপ ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের মাঝপথে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। মাঝমাঠ থেকে আসা একটি থ্রু পাস ধরে প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগের ডিফেন্ডারদের গতির জাদুতে পরাস্ত করেন এমবাপে। গোলরক্ষককে একা পেয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এক নিখুঁত ও কোনাকুনি শটে বল জালে জড়ান এই বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ড। স্টেডিয়ামে তখন ফরাসি সমর্থকদের আনন্দের জোয়ার। এই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও প্যারাগুয়ের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন এমবাপেই। ডি-বক্সের ঠিক ওপর থেকে এক বুলেট গতির শটে দলের হয়ে দ্বিতীয় এবং নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন তিনি (৩-০)। এই জোড়া গোলের মাধ্যমে এমবাপে প্রমাণ করলেন কেন তাকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়।
প্যারাগুয়ের সান্ত্বনা ও ফ্রান্সের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত
ম্যাচের শেষ দিকে তিন গোলে পিছিয়ে পড়ে কিছুটা মরিয়া হয়ে ওঠে প্যারাগুয়ে। কোচ মাঠের সাইডলাইন থেকে অল-আউট আক্রমণের নির্দেশ দেন এবং ফরাসি ডিফেন্সের একটি ছোট ভুলের সুযোগ নিয়ে ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে একটি সান্ত্বনাসূচক গোল পরিশোধ করে লাতিন আমেরিকার দলটি (৩-১)। তবে এই গোলটি কেবল তাদের হারের ব্যবধানই কমিয়েছে, কিন্তু ফ্রান্সের দাপুটে জয়ের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো ফ্রান্স দল। বিপরীতে, টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় সারপ্রাইজ প্যাকেজ হিসেবে কোয়ালিফাই করা প্যারাগুয়েকে চোখের জলে বিদায় নিতে হয় বিশ্বমঞ্চ থেকে। এই দাপুটে জয়ের পর ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মরক্কোর, যারা অন্য ম্যাচে কানাডাকে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এই অপ্রতিউদ্ধার্য রূপ কোয়ার্টার ফাইনালেও বজায় থাকে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।