Home পরিবেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে দেশ: পাহাড় ধসে ৯ প্রাণহানি, যমুনার ভাঙনে বিলীন ২০০ মিটার জনপদ ও খাগড়াছড়িতে পর্যটন ঝুঁকি

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে দেশ: পাহাড় ধসে ৯ প্রাণহানি, যমুনার ভাঙনে বিলীন ২০০ মিটার জনপদ ও খাগড়াছড়িতে পর্যটন ঝুঁকি

0
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে দেশ: পাহাড় ধসে ৯ প্রাণহানি, যমুনার ভাঙনে বিলীন ২০০ মিটার জনপদ ও খাগড়াছড়িতে পর্যটন ঝুঁকি
পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস এবং নির্বিচারে পাহাড় কাটার মাশুল! ভারী বৃষ্টিতে যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে আরও বড় বিপর্যয়।

নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪

৬ জুলাই ২০২৬ 

দেশের সামগ্রিক আবহাওয়া পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। একদিকে যেমন অতি ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসে ঝরছে তাজা প্রাণ, অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও তীব্র নদী ভাঙনে বিলীন হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা। একই সাথে পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে তৈরি হয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। সব মিলিয়ে এক চরম মানবিক ও পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি দেশের বেশ কয়েকটি জেলা।

এই দুর্যোগগুলো কেন ঘটছে, সামনে পরিস্থিতি আরও কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী—তা নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধান।

কক্সবাজারে পাহাড় ধস: রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও শহরে ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু

গত কয়েকদিনের টানা অতি ভারী বর্ষণের ফলে পর্যটন নগরী কক্সবাজার এবং উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

ক্যাম্প ও শহরের চিত্র:

রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প: উখিয়ার একাধিক ক্যাম্পে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা ঘরবাড়ির ওপর ওপর থেকে বিশাল মাটির স্তূপ ধসে পড়ে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কয়েকজন নিখোঁজ হন এবং পরে উদ্ধারকারীরা নারী ও শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেন।

কক্সবাজার শহর: শুধু ক্যাম্পেই নয়, কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোও এই দুর্যোগের শিকার হয়েছে। অতি বৃষ্টির কারণে মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

পাহাড় ধস কেন হচ্ছে?

পাহাড় কাটা ও বন নিধন: আবাসন ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে পাহাড়ের ভেতরের মাটির বাঁধন আলগা হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলার কারণে মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে গেছে।

টানা অতি ভারী বর্ষণ: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে মাটি পানি শোষণ করতে করতে একপর্যায়ে ভার সইতে না পেরে ধসে পড়ছে।

ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপন: পাহাড়ের খাড়া ঢালে বা পাদদেশে অপরিকল্পিত ও কাঁচা ঘরবাড়ি নির্মাণ করার কারণে সামান্য ধসও বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ভবিষ্যতে আরও পাহাড় ধসের সম্ভাবনা বা ঝুঁকি:

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের যে ধারা চলছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়বে। যদি এখনই পাহাড় কাটা বন্ধ করা এবং পাহাড়ের ঢাল থেকেঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলাগুলোতে আরও বড় আকারের এবং ঘন ঘন পাহাড় ধসের বিপর্যয় ঘটার শতভাগ আশঙ্কা রয়েছে।

ধুনটে যমুনার গ্রাস: ১২ দিনে নদীগর্ভে ২০০ মিটার এলাকা

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিগত মাত্র ১২ দিনে উপজেলার নদী তীরবর্তী অঞ্চলের প্রায় ২০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে।

ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ:

বসতভিটা ও ফসলি জমি: নদী ভাঙনের ফলে বিঘার পর বিঘা আবাদি জমি, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এবং বহু মানুষের পৈতৃক ভিটেমাটি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। বহু পরিবার রাতারাতি গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।

স্থাপনা ও বাঁধের ঝুঁকি: ভাঙন পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, স্থানীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয় এখন চরম হুমকির মুখে রয়েছে।

নদী ভাঙন কেন তীব্র হচ্ছে? (মূল কারণসমূহ):

পাহাড়ি ঢল ও পলি জমা: ভারত থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানির চাপ এবং সেই সাথে আসা পলি নদীর তলদেশ ভরাট করে দিচ্ছে। ফলে নদীর ধারণক্ষমতা কমে গিয়ে পানি দুই কূলে তীব্র আঘাত হানছে।

নদী থেকে বালু উত্তোলন: যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে নদীর তলদেশের গঠন ভেঙে পড়ছে, যা তীরের মাটিকে ধসে পড়তে বাধ্য করছে।

টেকসই বাঁধের অভাব: ভাঙনপ্রবণ এলাকায় স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে সিসি ব্লক বা টেকসই বাঁধ না দিয়ে সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ফেলার কারণে তা তীব্র স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।

ভবিষ্যতে নদী ভাঙনের সম্ভাবনা বা ঝুঁকি:

হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া এবং উজানে বৃষ্টিপাত বাড়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে আমাদের দেশের নদীগুলোতে পানির প্রবাহ দিন দিন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে। ধুনটসহ যমুনা, পদ্মা ও মেঘনার অববাহিকায় আগামী বছরগুলোতে ভাঙনের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সঠিক ড্রেজিং (নদী খনন) এবং স্থায়ী বাঁধ না দিলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে থাকবে।

খাগড়াছড়িতে পর্যটন ঝুঁকি: নড়বড়ে ‘স্বর্গের সিঁড়ি’

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খাগড়াছড়ির অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় আকর্ষণ ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ বর্তমানে পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি এই দর্শনীয় স্থানে যাতায়াতের এবং আরোহণের মূল কাঠামোটি নড়বড়ে হয়ে পড়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঝুঁকির কারণ ও বর্তমান অবস্থা:

রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: সাম্প্রতিক সময়ে টানা বৃষ্টিপাত এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সিঁড়িটির গোড়ার মাটি আলগা হয়ে গেছে। কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এটি এখন কাঁপতে থাকে।

পর্যটকদের অসচেতনতা: ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন শত শত পর্যটক সেখানে ভিড় করছেন এবং ছবি তুলতে গিয়ে নিজেদের জীবন বিপন্ন করছেন।

ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা:

পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি বৃষ্টির দিনে খুবই পিচ্ছিল এবং ধসপ্রবণ থাকে। এই নড়বড়ে সিঁড়িতে যদি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ একসাথে ওঠে, তবে যেকোনো মুহূর্তে পুরো কাঠামোটি ভেঙে শত ফুট নিচে পড়ে গিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাধারণ মানুষের সতর্কবার্তা ও করণীয়

প্রকৃতির এই রুদ্র রূপের সামনে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে সাধারণ নাগরিক এবং প্রশাসনের জন্য কিছু জরুরি সতর্কবার্তা ও করণীয় নিচে তুলে ধরা হলো:

পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের জন্য সতর্কবার্তা:আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর: ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ামাত্র পাহাড়ের পাদদেশে বা ঢালে বসবাসকারীদের কোনো দ্বিধা না করে দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে হবে।

ফাটল পর্যবেক্ষণ: পাহাড়ে বা ঘরের আশপাশের মাটিতে কোনো নতুন ফাটল বা ধস দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে জানাতে হবে এবং এলাকা ত্যাগ করতে হবে।

মাইকিং ও সতর্ক সংকেত: স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া মাইকিং বা লাল পতাকা প্রদর্শনের মতো সতর্কবার্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

নদী ভাঙন কবলিত এলাকার জন্য করণীয়:

জরুরি স্থানান্তর পরিকল্পনা: নদীর পানি দ্রুত বাড়লে ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র, গবাদি পশু এবং দলিলপত্র আগেই নিরাপদ বা উঁচু স্থানে সরিয়ে নিতে হবে।

বালু উত্তোলন বন্ধে সোচ্চার হওয়া: নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে।

নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা: ভাঙন চলকালীন সময়ে নদীর একদম পাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বা গৃহপালিত পশু বেঁধে রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে।

পর্যটকদের জন্য জরুরি নির্দেশনা:

ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ভ্রমণ বর্জন: বর্ষা মৌসুমে বা ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ি ঝরনা, খাড়া পাহাড় কিংবা ‘স্বর্গের সিঁড়ি’র মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোতে যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে।

অ্যাডভেঞ্চার ট্র্যাকিং বন্ধ রাখা: এই সময়ে পাহাড়ি দুর্গম রাস্তায় ট্র্যাকিং বা ক্যাম্পিং করা অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাই স্থানীয় গাইড বা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ

স্থায়ী বাঁধ ও নদী খনন: ধুনটসহ সারা দেশের ভাঙনপ্রবণ এলাকায় অস্থায়ী জিও ব্যাগের ওপর নির্ভর না করে সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি নদীর নাব্যতা বাড়াতে নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে।

পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর আইন: পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ (Zero Tolerance) নীতি গ্রহণ করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়ে ব্যাপক হারে বনায়ন করতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো সংস্কার: খাগড়াছড়ির ‘স্বর্গের সিঁড়ি’সহ দেশের সকল ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র দ্রুত সংস্কার করতে হবে এবং সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

প্রকৃতির এই দুর্যোগগুলোকে পুরোপুরি এড়ানো হয়তো সম্ভব নয়, তবে সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি, সতর্কতা এবং টেকসই পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা অকাল প্রাণহানি এবং বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই কমিয়ে আনতে পারি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here