নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪
ঢাকা, ৬ জুলাই ২০২৬
প্রকৃতির অপার বিস্ময় আর রহস্যের কোনো শেষ নেই। এই পৃথিবীতেই এমন কিছু স্থান রয়েছে যা মানুষের চেনা বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে আন্দিজ পর্বতমালার চূড়ার কাছাকাছি অবস্থিত তেমনই এক জাদুকরী স্থান হলো ‘স্যালার ডি উইউনি’ (Salar de Uyuni)। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম লবণের মরুভূমি (Salt Flat)। তবে এর আসল জাদু প্রকাশ পায় বর্ষাকালে, যখন এটি রূপান্তরিত হয় “পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আয়না”-তে। এই সময় মাটিতে দাঁড়িয়ে আকাশ আর মাটির পার্থক্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মনে হয় যেন আপনি মহাশূন্যে বা মেঘের ওপর হেঁটে বেড়াচ্ছেন।’অজানা পৃথিবী’র এই অন্তহীন শ্বেতশুভ্র লবণের চাদরের ইতিহাস, এর পেছনের বিজ্ঞান এবং পর্যটকদের জন্য এর আকর্ষণ নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধান।
স্যালার ডি উইউনি কী? এর ভৌগোলিক অবস্থান
স্প্যানিশ শব্দ ‘স্যালার’ (Salar) অর্থ লবণের মরুভূমি বা সল্ট ফ্ল্যাট এবং ‘উইউনি’ (Uyuni) এসেছে স্থানীয় আইমারা ভাষা থেকে, যার অর্থ অবরুদ্ধ বা ঘেরা স্থান। বলিভিয়ার আলতিপ্লানো অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১ হাজার ৯৯৫ ফুট (৩,৬৫৬ মিটার) উঁচুতে এই বিস্ময়কর স্থানটি অবস্থিত।প্রায় ১০ হাজার ৫৮২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই মরুভূমিটি সম্পূর্ণ সমতল এবং এটি কোটি কোটি টন খাঁটি লবণে ঢাকা। আমেরিকার বিখ্যাত ডেথ ভ্যালির চেয়েও এটি প্রায় ২৫ গুণ বড়। তীব্র রোদে এই দিগন্ত বিস্তৃত সাদা লবণের স্তর চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, যা দূর থেকে দেখলে বরফের চাদর বলে ভ্রম হয়।
সৃষ্টির প্রাচীন ইতিহাস: কীভাবে তৈরি হলো এই লবণের মরুভূমি?
স্যালার ডি উইউনির ইতিহাস কোটি কোটি বছর পুরোনো। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাগৈতিহাসিক আমলে এই বিশাল অঞ্চলটি কোনো মরুভূমি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি প্রকাণ্ড প্রাগৈতিহাসিক হ্রদ বা সমুদ্রের অংশ, যার নাম ছিল ‘লেক মিনচিন’ (Lake Minchin)।
যেভাবে লবণের মরুভূমি তৈরি হলো:
হ্রদের শুকিয়ে যাওয়া: প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এবং প্রচণ্ড তাপে এই বিশাল হ্রদের পানি ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে শুকিয়ে যেতে শুরু করে।
লবণের স্তর জমা: হ্রদের পানি শুকিয়ে গেলেও পানিতে থাকা বিপুল পরিমাণ খনিজ ও লবণ নিচে জমা হতে থাকে। হাজার হাজার বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলার পর হ্রদটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় এবং রেখে যায় লবণের দুটি বিশাল স্তর—যার একটি এই ‘স্যালার ডি উইউনি’।
লিথিয়ামের মহাসমুদ্র: এই মরুভূমির ওপরের স্তরটি লবণের হলেও, এর মাটির নিচে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় লিথিয়ামের খনি। আধুনিক ব্যাটারি প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত মূল্যবান এই লিথিয়ামের বৈশ্বিক মজুদের প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশই রয়েছে এই স্যালার ডি উইউনির নিচে।
বর্ষার জাদু: যখন মাটি হয়ে ওঠে আকাশ
সারা বছর এই মরুভূমিটি শুকনো, খটখটে সাদা এবং বহুভুজ আকৃতির লবণের স্ফটিক দিয়ে ঢাকা থাকে। কিন্তু ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাসের বর্ষাকালে এখানে এক অলৌকিক পরিবর্তন ঘটে।পার্শ্ববর্তী হ্রদগুলো থেকে উপচে পড়া পানি যখন এই সম্পূর্ণ সমতল লবণের স্তরের ওপর জমা হয়, তখন এখানে মাত্র কয়েক ইঞ্চি গভীর একটি পাতলা পানির স্তর তৈরি হয়। লবণের এই শক্ত সমতল স্তরটি পানিকে মাটির নিচে শুষে নিতে দেয় না। ফলে এই স্বচ্ছ পানির স্তরটি একটি নিখুঁত কাঁচ বা আয়নার মতো কাজ করে।এই সময় ওপরের নীল আকাশ, সাদা মেঘ, সূর্য কিংবা রাতের কোটিকোটি নক্ষত্র হুবহু নিচের মাটিতে প্রতিফলিত হয়। আপনি যখন এর ওপর দিয়ে হাঁটবেন, আপনার মনে হবে আপনি শূন্যে ভেসে আছেন। এই দৃশ্য দেখার জন্য পৃথিবীর কোণ কোণ থেকে আলোকচিত্রী ও পর্যটকেরা এই সময়ে বলিভিয়ায় ছুটে আসেন।
পর্যটকদের জন্য মূল আকর্ষণ ও ভ্রমণ গাইড
অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের জন্য স্যালার ডি উইউনি এক স্বর্গরাজ্য। এখানে ভ্রমণের সময় পর্যটকরা বেশ কিছু অনন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন:
সম্পূর্ণ লবণের তৈরি হোটেল (Palacio de Sal)
এই মরুভূমির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এখানকার হোটেলগুলো। যেহেতু আশেপাশে কোনো পাথর বা কাঠ নেই, তাই পর্যটকদের থাকার জন্য সম্পূর্ণ লবণ দিয়ে হোটেল তৈরি করা হয়েছে। হোটেলের দেয়াল, ছাদ, খাট, টেবিল এমনকি চেয়ারগুলোও খাঁটি লবণের ব্লক দিয়ে তৈরি!
ট্রেনের কবরস্থান (Train Cemetery)
উইউনি শহরের ঠিক বাইরেই রয়েছে একটি ঐতিহাসিক স্থান, যাকে বলা হয় ‘গ্রেভইয়ার্ড অফ ট্রেনস’। ১৯ শতকের শেষের দিকে এই অঞ্চলে খনিজ বহনের জন্য ব্রিটিশ প্রকৌশলীদের সহায়তায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে খনি শিল্প ধসে পড়লে ট্রেনগুলো এখানেই পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। মরুভূমির নোনা বাতাসে মরিচা ধরা এই প্রাচীন ট্রেনগুলো এখন পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় ফটোশুটের জায়গা।
ইনকাহুয়াসি দ্বীপ (Incahuasi Island)
দিগন্ত বিস্তৃত এই লবণের সাগরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি ছোট পাথুরে দ্বীপ। প্রাচীন এই দ্বীপটি মূলত একটি প্রাগৈতিহাসিক আগ্নেয়গিরির চূড়া, যা হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ার পর জেগে উঠেছে। এই দ্বীপের মূল আকর্ষণ হলো শত শত বছর পুরোনো বিশাল আকৃতির ক্যাকটাস গাছ, যার কোনো কোনোটি ৩০ ফুটেরও বেশি লম্বা। দ্বীপের ওপর থেকে পুরো লবণের মরুভূমির ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ দেখা যায়।বলিভিয়ার স্যালার ডি উইউনি প্রকৃতির এমন এক অনন্য সৃষ্টি, যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। এটি কেবল একটি লবণের খনি বা পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি পৃথিবীর বুকে প্রকৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাণিজ্যিক লিথিয়াম উত্তোলনের কারণে এই অপরূপ স্থানটি বর্তমানে কিছুটা পরিবেশগত হুমকির মুখে থাকলেও, এর আদিম সৌন্দর্য আজও বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দেয়। ‘অজানা পৃথিবী’র এই জাদুকরী আয়না আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই ধরণী কতটা সুন্দর ও রহস্যময়।