স্বাস্থ্য ও পুষ্টি ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪:
‘ক্যান্সার’—শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ। সাধারণ মানুষের মাঝে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, এই রোগে আক্রান্ত হওয়া মানেই জীবনের ইতি বা সব শেষ। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে এই ধারণা এখন সম্পূর্ণ ভুল ও অতীত। চিকিৎসকদের মতে, ক্যান্সার মানেই জীবনের শেষ নয়; বরং সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা পেলে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। তবে এর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চেনা এবং অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
ক্যান্সার মানেই কি সব শেষ? চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে?
এক দশক আগেও ক্যান্সারের চিকিৎসা যতটা জটিল এবং সীমিত ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক উন্নত। এখন আর্লি ডিটেকশন বা প্রাথমিক অবস্থায় যদি ক্যান্সার ধরা পড়ে, তবে সঠিক থেরাপির (যেমন: সার্জারি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি) মাধ্যমে তা শতভাগ নিরাময় করা সম্ভব। স্তন ক্যান্সার, জরায়ুমুখের ক্যান্সার বা কোলন ক্যান্সারের মতো অনেক জটিল ক্যান্সারও যদি প্রথম বা দ্বিতীয় স্টেজে ধরা পড়ে, তবে রোগী দীর্ঘ বছর সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তাই ভয় না পেয়ে, লক্ষণগুলো চিনে সচেতন হওয়াই এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
যেসব লক্ষণ দেখলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের কাছে যাবেন
ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট ধরণ অনুযায়ী লক্ষণ আলাদা হলেও, শরীরে কিছু সাধারণ পরিবর্তন দেখা দিলে তা মোটেও এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়:
- ১. দ্রুত ও অকারণ ওজন হ্রাস:
ডায়েট বা কোনো রকম শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই যদি হঠাৎ করে শরীর থেকে দ্রুত ওজন কমতে শুরু করে (যেমন এক বা দুই মাসে ৫-১০ কেজি), তবে তা পাকস্থলী, ফুসফুস বা অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের প্রাথমিক সংকেত হতে পারে। - ২. দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অবসাদ:
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরেও যদি শরীর সারাক্ষণ ক্লান্ত ও দুর্বল লাগে, তবে তা রক্তাল্পতা বা লিউকেমিয়ার (ব্লাড ক্যান্সার) মতো রোগের লক্ষণ হতে পারে। - ৩. শরীরে অস্বাভাবিক চাকা বা দলা (Lump):
শরীরের যেকোনো অংশে, বিশেষ করে স্তন, বগল, গলা বা টেস্টিকল-এ যদি কোনো চাকা বা মাংসের দলা অনুভূত হয় এবং তাতে কোনো ব্যথা না থাকে, তবে দেরি না করে পরীক্ষা করানো জরুরি। - ৪. দীর্ঘদিনের কাশি ও কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন:
সাধারণ ঠাণ্ডা লাগা ছাড়াই যদি একটানা ৩-৪ সপ্তাহের বেশি কাশি থাকে, কাশির সাথে রক্ত আসে কিংবা গলার স্বর বসে বা ভেঙে যায়, তবে তা ফুসফুস বা গলার ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। - ৫. তিল বা আঁচিলের আকস্মিক পরিবর্তন:
শরীরে থাকা কোনো পুরনো তিল বা আঁচিলের আকার, আকৃতি বা রঙ যদি হঠাৎ দ্রুত বদলাতে শুরু করে, চুলকায় বা রক্তপাত হয়, তবে তা স্কিন ক্যান্সার বা মেলানোমার ইঙ্গিত দেয়। - ৬. মলত্যাগ বা প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তন:
দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাতলা পায়খানার সমস্যা, মলের সাথে রক্ত যাওয়া কিংবা প্রস্রাবের বেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা বা প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া কোলন বা মূত্রাশয়ের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। - ৭. দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা ক্ষত না শুকানো:
শরীরের কোথাও ব্যথা হলে এবং তা ওষুধ খাওয়ার পরও ভালো না হলে, কিংবা মুখের ভেতরে বা শরীরের কোনো ক্ষত দীর্ঘদিনেও না শুকালে তা ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
স্ক্রিনিং এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
৪০ বছর বয়সের পর নারী ও পুরুষ উভয়েরই বছরে অন্তত একবার রেগুলার হেলথ চেকআপ বা নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সার স্ক্রিনিং (যেমন: ম্যামোগ্রাফি, প্যাপ স্মিয়ার বা কোলনোস্কোপি) করা উচিত। এটি শরীরে ক্যান্সারের উপস্থিতি থাকলে তা একদম প্রাথমিক পর্যায়ে ধরে ফেলে, যা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে।
সমাপনী কথা
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ‘ভয়’ এবং ‘অসচেতনতা’। লক্ষণ লুকিয়ে না রেখে বা ভীতিতে আক্রান্ত না হয়ে শুরুতেই সঠিক পদক্ষেপ নিলে ক্যান্সারকে জয় করা সম্ভব। দিনশেষে সচেতনতাই পারে একটি জীবনকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে।
সুস্থ জীবনধারা, বিভিন্ন জটিল রোগের লক্ষণ ও ঘরোয়া স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক সব দরকারি প্রতিবেদন সবার আগে পড়তে পাবনা নিউজ ২৪-এর সাথেই থাকুন।