নিউজ ডেস্ক || পাবনা নিউজ ২৪
৮ জুলাই, ২০২৬
বর্ষার চিরচেনা রূপ এখন দেশজুড়ে এক আতঙ্কের নাম। সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে বাংলাদেশজুড়ে শুরু হয়েছে আষাঢ়ের রেকর্ডভাঙা তাণ্ডব। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (BMD) দেশের চার থেকে পাঁচটি বিভাগে আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার জন্য ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের বিশেষ সতর্কবার্তা (Red Alert) জারি করেছে। আবহাওয়া অফিসের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।টানা এই অতিবৃষ্টির কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো এক ভয়াবহ বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) এবং তীব্র জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়েছে কোটি মানুষের জনজীবন। সারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পাবনা নিউজ ২৪-এর এই বিশেষ অনুসন্ধান।
পানির নিচে বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রাম ও সাজেক ভ্যালিতে পর্যটন বন্ধ
গত কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণে দেশের প্রধান বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রাম সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজার, চকবাজার, বহদ্দারহাটসহ নিচু এলাকাগুলো এখন হাঁটু থেকে কোমর পানিতে নিমজ্জিত। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে এবং ড্রেনেজ লাইনের ময়লা পানি উপচে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।এদিকে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে রাঙামাটির বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ‘সাজেক ভ্যালি’ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের মাইছছড়ি এলাকায় পাহাড়ি ঢলে রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে শত শত পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একই সাথে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলমান এইচএসসি (HSC) ও সমমানের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।
পাহাড়ধসে প্রাণহানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন বান্দরবান
টানা অতিবৃষ্টির সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে পার্বত্য জেলাগুলোতে। গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে দেশের সর্বোচ্চ ২৪০ থেকে ২৬৭ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মাটি নরম হয়ে যাওয়ার কারণে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এবং কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় দেয়াল ধসে ও পাহাড়ধসে অন্তত ৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পাহাড়ধসের কারণে বান্দরবান জেলার প্রধান বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর পানি হু হু করে বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা চকরিয়া ও রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাকে প্লাবিত করেছে। উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকি থাকায় সেখান থেকে হাজার হাজার মানুষকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিভাগভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কতা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে আগামী কয়েকদিনের পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিভাগ | বৃষ্টির তীব্রতা | সম্ভাব্য ঝুঁকি |
| চট্টগ্রাম ও বরিশাল | অতি ভারী বর্ষণ (৮৮+ মি.মি.) | পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস |
| সিলেট ও ময়মনসিংহ | ভারী থেকে অতি ভারী | হাওর অঞ্চলে বন্যা ও নদীর পানি বৃদ্ধি |
| ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনা | মাঝারি থেকে ভারী | শহুরে জলাবদ্ধতা ও বজ্রপাত |
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সতর্কবার্তা: বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (FFWC) জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে জুলাই ও আগস্ট মাসে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও সুনামগঞ্জের নিচু এলাকাগুলো বড় ধরনের বন্যার কবলে পড়তে পারে।
বিরূপ আবহাওয়ার মূল কারণ কী?
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি ভারতের ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের দিকে চলে গেলেও এর তীব্র লেজ বা সক্রিয় মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর পুরোপুরি অবস্থান করছে। সাগরের প্রবল জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস দেশের ওপর এসে ঘন মেঘের সৃষ্টি করছে, যার ফলে এই বিরূপ ও দীর্ঘস্থায়ী অতিবৃষ্টির সৃষ্টি হচ্ছে। উপকূলের মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।