Home ফিচার ঝুমুর নাচের শেষ নূপুর: চা বাগানের নারী শ্রমিকদের ভেতরের দীর্ঘশ্বাস ও সংস্কৃতি

ঝুমুর নাচের শেষ নূপুর: চা বাগানের নারী শ্রমিকদের ভেতরের দীর্ঘশ্বাস ও সংস্কৃতি

0
ঝুমুর নাচের শেষ নূপুর: চা বাগানের নারী শ্রমিকদের ভেতরের দীর্ঘশ্বাস ও সংস্কৃতি
মাথায় ঐতিহ্যবাহী মাথাল (টোকা) পরে চড়া রোদ উপেক্ষা করে পরম মমতায় চা পাতা চয়নে ব্যস্ত এক চা-কন্যা; যার আঙুলের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।

নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪

 দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট আর শ্রীমঙ্গলের সবুজ পাহাড়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে যেন এক সবুজ গালিচা বিছিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। এই অপরূপ সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ছুটে যান সেখানে। কিন্তু এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক শতাব্দীপ্রাচীন করুণ ইতিহাস, রক্ত জল করা খাটুনি আর বেঁচে থাকার এক নির্মম আখ্যান। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই পিঠে বাঁশের টুকরি বেঁধে সবুজ পাতার সমুদ্রে হারিয়ে যান যে নারীরা, তাদের জীবনের গল্পটা কেবলই বঞ্চনার। অথচ, সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর নামমাত্র মজুরির তীব্র মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি শেষে, মাদলের গুরুগুরু আওয়াজে যখন নূপুর বেজে ওঠে, তখন তারা সব কষ্ট ভুলে মেতে ওঠেন এক আদিম ও ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্যে—যার নাম ‘ঝুমুর’।

দুটি পাতা একটি কুঁড়ি: সস্তা শ্রম ও নারী শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনি

বাংলাদেশের চা শিল্প টিকে আছে মূলত নারী শ্রমিকদের আঙুলের জাদুতে। পুরুষদের তুলনায় নারীরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তুলতে পারেন বলে বাগানের সিংহভাগ মাঠকর্মীই নারী। কিন্তু এই নৈপুণ্যের বিনিময়ে তারা যা পান, তা বর্তমান বাজারের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।

নামমাত্র মজুরিতে জীবন যুদ্ধ

শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগানের নারী শ্রমিক বাসন্তী রবিদাসের (৩৫) সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের দৈনন্দিন জীবনের রূঢ় বাস্তবতা। প্রতিদিন কুয়াশাভেজা ভোরে চা গাছের সারির মাঝে দাঁড়িয়ে শুরু হয় তাদের কাজ। জোঁক, সাপ আর পোকামাকড়ের কামড়ের ভয় উপেক্ষা করে দিনশেষে একজন শ্রমিককে নির্দিষ্ট ওজনের পাতা তুলতে হয়। ২০২৬ সালের এই আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির বাজারেও দিনে মাত্র ১৭০ থেকে আড়াইশো টাকার মতো দৈনিক মজুরি পান তারা। বাসন্তী বলেন, “এই সামান্য কয়টা টাকায় ছাওয়াল-পাওয়ালের পড়ালেখা আর দুবেলা পেট ভরে ভাত খাওয়ানোই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অসুখ-বিসুখ হলে তো কথাই নেই।”

পুষ্টিহীনতা ও মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য ঝুঁকি

সারাদিন দাঁড়িয়ে পিঠে ভারী বোঝা নিয়ে কাজ করার ফলে এই নারী শ্রমিকদের অধিকাংশেরই কোমর ও পায়ের হাড়ের ক্ষয় রোগ দেখা দেয়। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাব এবং বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে তারা প্রতিনিয়ত রক্তস্বল্পতাসহ নানা জরায়ুঘটিত রোগে ভোগেন। মাতৃত্বকালীন সময়েও অনেকে বাধ্য হয়ে কঠিন পরিশ্রম করেন, যা তাদের এবং নবজাতকের স্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।

ভাষা ও সংস্কৃতির সংকট: মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এক জনপদ

১৮৫০-এর দশকে ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতের ওড়িশা, বিহার, উত্তর প্রদেশ ও ঝাড়খণ্ড থেকে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে এই অঞ্চলের মানুষদের চা শ্রমিক হিসেবে নিয়ে এসেছিল। আজ প্রায় পৌনে দুই শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তারা এ দেশের মূল সমাজ ব্যবস্থার সাথে পুরোপুরি মিশতে পারেননি।চা শ্রমিকদের নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতির বাইরে সাধারণ মানুষ এখনো অনেক সময় তাদের ‘কুলি’ বা বহিরাগত হিসেবে দেখে। এই মনস্তাত্ত্বিক বৈষম্য তাদের নতুন প্রজন্মের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।চা বাগানের শ্রমিকেরা নিজেদের মধ্যে ‘সাদরি’ ভাষায় কথা বলেন। এছাড়া ওড়িয়া, ভোজপুরি ও সাঁওতালি ভাষার এক মিশ্র রূপ দেখা যায় তাদের কথ্য ভাষায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ভাষাগুলোর সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ না থাকায়, নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি হারাতে বসেছে। তারা না পারছে পুরোপুরি বাংলা সংস্কৃতির অংশ হতে, না পারছে নিজেদের আদিম ঐতিহ্যকে শতভাগ ধরে রাখতে।

ঝুমুর নাচের শেষ নূপুর: যখন মাদলের তালে সব দুঃখ হারিয়ে যায়

এত বঞ্চনা, হাহাকার আর কষ্টের পরেও চা শ্রমিকদের বেঁচে থাকার প্রধান অক্সিজেন হলো তাদের লোকসংস্কৃতি। বিশেষ করে দুর্গাপূজা, ফাগুয়া (হোলি) কিংবা করম উৎসবের দিনগুলোতে চা বাগানগুলো যেন এক অন্য রূপ ধারণ করে।

দুঃখ ভোলার জাদুকরী ছন্দ

উৎসবের রাতে যখন চা বাগানের আঙিনায় বিশাল মাদল, ধামসা আর বাঁশির সুর বেজে ওঠে, তখন বাসন্তী, লক্ষ্মী কিংবা সুমিত্রারা তাদের সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে ফেলেন। লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে, একে অপরের কোমর জড়িয়ে ধরে তারা বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে যান। পায়ের নূপুরের ঝনঝন শব্দ আর মাদলের তালের মেলবন্ধনে শুরু হয় ‘ঝুমুর’ নাচ।

গানের বাণীতে জীবনের গল্প

ঝুমুর নাচের সাথে যে গানগুলো গাওয়া হয়, তার কথামালা অত্যন্ত সহজ কিন্তু গভীর। গানের লাইনে লাইনে ফুটে ওঠে তাদের পূর্বপুরুষদের দেশ ছাড়ার বেদনা, চা পাতার গন্ধমাখা জীবনের কষ্ট এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা। ঝুমুর যেন কেবল একটি নাচ নয়; এটি তাদের শত বছরের পুঞ্জীভূত বেদনাকে আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার এক জাদুকরী মাধ্যম। নূপুরের প্রতিটা আঘাতে তারা যেন বলতে চান—”আমরা বেঁচে আছি, আমাদের সংস্কৃতি বেঁচে আছে।”

উন্নয়ন ও অধিকার: কী ভাবছে নীতিনির্ধারকেরা?

চা শ্রমিকদের এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে রাষ্ট্র ও বাগান মালিকপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি:

ন্যায্য মজুরি ও রেশন নিশ্চিতকরণ: বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা এবং দৈনিক মজুরি অবিলম্বে পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

সাংস্কৃতিক একাডেমি স্থাপন: সিলেটের চা বাগান অঞ্চলে একটি বিশেষ নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি স্থাপন করে ‘ঝুমুর’ নাচ, সাদরি ভাষা এবং তাদের অনন্য লোকগাথাগুলো নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করা উচিত।

পর্যটনে সম্পৃক্তকরণ: শ্রীমঙ্গল বা সিলেটের পর্যটনে এই ঝুমুর নাচকে সম্মানজনক উপায়ে উপস্থাপন করা যেতে পারে, যাতে নারী শিল্পীরা আর্থিকভাবে লাভবান হন এবং তাদের লোকসংস্কৃতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

“ঝুমুর নাচের শেষ নূপুর” আসলে চা বাগানের নারীদের দ্বিমুখী জীবনের এক জীবন্ত দলিল। একহাতে তারা তুলে নিচ্ছেন দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ‘চা পাতা’, আর অন্যহাতে আঁকড়ে ধরে রাখছেন তাদের হাজার বছরের প্রাচীন লোকসংস্কৃতি। নূপুরের আওয়াজ যতক্ষণ সচল থাকবে, ততক্ষণ তাদের এই লড়াইও জারি থাকবে। তবে শুধু উৎসবের দিনে তাদের নাচ দেখে হাততালি দিলেই চলবে না; তাদের ভেতরের দীর্ঘশ্বাসটুকু অনুধাবন করে তাদের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব।

জাতীয় সংসদে সম্প্রতি চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূরীকরণে দৈনিক মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর জন্য একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য যুক্তি তুলে ধরেন যে, বর্তমান ২০২৬ সালের আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের বাজারে মাত্র ১৭০ থেকে ২৫০ টাকা মজুরিতে একটি পরিবারের টিকে থাকা অসম্ভব। উত্থাপিত এই নতুন প্রস্তাবে চা শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, আবাসন, চিকিৎসা ও শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ৫০০ টাকা করার জোর দাবি জানানো হয়। সরকার পক্ষ থেকেও এই প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে বাগান মালিকদের সাথে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে একটি সম্মানজনক ও বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, যা বছরের পর বছর ধরে শোষিত এই প্রান্তিক জনপদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি বড় মাইলফলক হতে পারে। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here