পাবনা নিউজ ২৪ ফিচার ডেস্ক: জাপানি খাবার বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুশি, রামেন কিংবা কাঁচা মাছের নানা পদ। সুদূর সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের মানুষের খাবারের রুচি ও স্বাদ আমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু সেই জাপানের বুকেই এখন দেদারসে বিকোচ্ছে বাঙালির খাঁটি সরষে ইলিশ, ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি, মুচমুচে শিঙাড়া, টক-ঝাল ফুচকা আর জিভে জল আনা মিষ্টি ‘গুলবাহার’!
ভাবছেন এটা কীভাবে সম্ভব হলো? টোকিও থেকে ওসাকা—জাপানের ব্যস্ত শহরগুলোর রাস্তায় কীভাবে জায়গা করে নিল আমাদের এই চেনা স্ট্রিট ফুড ও ঐতিহ্যবাহী খাবার? এর পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর গল্প।
১. প্রবাসীদের হাত ধরে শুরু, জাপানিদের মাঝে তুমুল ক্রেজ
গল্পের শুরুটা হয়েছিল জাপানে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের হাত ধরে। নিজেদের ঘরের খাবারের স্বাদ পেতে তারা টোকিও বা ওসাকার মতো শহরে ছোট ছোট রেস্তোরাঁ চালু করেন। তবে শুরুর দিকে ক্রেতা শুধু বাঙালিরা হলেও, ধীরে ধীরে জাপানিদের নজর কাড়ে এই মশলাদার খাবারগুলো।
বিশেষ করে টোকিওর শিনজুকু বা ইকেবুকুরো এলাকার কিছু ফুড ট্রাকে যখন মুচমুচে শিঙাড়া আর ফুচকা বিক্রি শুরু হয়, তখন কৌতুহলী জাপানিরা লাইনে দাঁড়িয়ে তা পরখ করতে শুরু করেন। ফুচকার ভেতরের আলু-মটর আর টক জলের কম্বিনেশন এখন জাপানি তরুণ-তরুণীদের কাছে এক অন্যরকম ‘অ্যাডভেঞ্চারাস’ ফুড!
২. বৃষ্টির দিনে জাপানেও এখন ‘খিচুড়ি-ইলিশ’
জাপানিদের প্রধান খাবার ভাত হলেও আমাদের মতো মশলাদার ভুনা খিচুড়ি তাদের কাছে ছিল একেবারেই নতুন। বাঙালি রেস্তোরাঁগুলো যখন জাপানিদের কম ঝালের রুচি অনুযায়ী একটু কাস্টমাইজ করে ঘি, গরম মশলা আর ইলিশ ভাজা দিয়ে খিচুড়ি পরিবেশন শুরু করল, তখন সেটি রাতারাতি হিট হয়ে যায়। জাপানের বৃষ্টির দিনে বা হালকা শীতের সন্ধ্যায় এখন অনেক জাপানি নাগরিকই সুশির বদলে গরম খিচুড়ির প্লেটে চামচ ডুবোচ্ছেন।
৩. ফুচকা ও শিঙাড়ার বিশ্বজয়
জাপানিরা সাধারণত মচমচে ও হালকা স্ন্যাকস পছন্দ করে। আমাদের শিঙাড়া (যা তারা এক ধরণের ‘ডাম্পলিং’ বা প্যাস্ট্রি হিসেবে দেখে) তাদের বিকেলের চায়ের আড্ডার সঙ্গী হয়ে উঠেছে। আর ফুচকা খাওয়ার স্টাইল—অর্থাৎ একবারে পুরোটা মুখে পুরে দেওয়া—জাপানিদের কাছে একটি দারুণ মজার অভিজ্ঞতা। টোকিওর বিভিন্ন ফুড ফেস্টিভ্যালে এখন ‘বেঙ্গলি ফুচকা’র স্টলগুলোতে জাপানিদের লম্বা লাইন দেখা যায়।
৪. মিষ্টির শেষ ছোঁয়া: রাজকীয় ‘গুলবাহার’
খাওয়াদাওয়ার পর জাপানিরা হালকা মিষ্টি পছন্দ করে। ছানা, মাওয়া আর পেস্তা-বাদামের সংমিশ্রণে তৈরি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ‘গুলবাহার’ এখন জাপানের ডেজার্ট কালচারে এক নতুন সংযোজন। অতিরিক্ত মিষ্টি না হওয়ায় এবং এর চমৎকার সুগন্ধের কারণে জাপানিরা ডিনারের শেষে এই মিষ্টিটিকে বেশ লুফে নিয়েছে। অনেক জাপানি বেকারিতে এখন লোকাল শেফরা বাঙালি মিষ্টি তৈরির প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন।
সংস্কৃতির সেতু বন্ধন
খাবার কেবল পেট ভরায় না, দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকেও কাছাকাছি নিয়ে আসে। খিচুড়ি, ফুচকা আর গুলবাহারের হাত ধরে সুদূর জাপানে এখন বাংলাদেশের নাম আর আতিথেয়তা ছড়িয়ে পড়ছে। জাপানিদের মুখে “ওইশি” (জাপানি ভাষায় যার অর্থ সুস্বাদু) শব্দের সাথে বাঙালির “দারুণ স্বাদ” মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।