পাবনা নিউজ ২৪ | ১৫ জুলাই, ২০২৬
বাংলাদেশে বর্তমানে এইচএসসি (HSC) ও সমমান পরীক্ষা নিয়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন অস্থিরতা। একদিকে দেশজুড়ে চলা টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন হাজারো পরীক্ষার্থী। ১৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন এখন কেবল ঢাকা নয়, ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বড় বড় শহরগুলোতে। শিক্ষামন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য এবং বৈরী পরিবেশের মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণের জেদ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
আন্দোলনের নেপথ্যের কারণ
পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি কোনোভাবেই পরীক্ষা দেওয়ার অনুকূলে নেই। দেশব্যাপী ভারী বর্ষণে রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে, অনেক জায়গায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। আন্দোলনের মূল কারণগুলো হলো:
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া: টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় যাতায়াত ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী যথাসময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারছেন না। অনেকেরই প্রবেশপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে, যা তাদের মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
প্রশ্নপত্রে মারাত্মক ভুল: পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নে বড় ধরনের ত্রুটি লক্ষ্য করা গেছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। সৃজনশীল প্রশ্নের কাঠামো ঠিক না থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রীর অসংবেদনশীল মন্তব্য: আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে শিক্ষামন্ত্রীর একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের দাবি, একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তির এমন মন্তব্য অত্যন্ত অপমানজনক। এর প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার।
শিক্ষার্থীদের ৪ দফা দাবি
বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ে রাজপথে অনড় অবস্থান নিয়েছেন। তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো:
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ: শিক্ষার্থীদের অপমান করার দায়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ।
পরীক্ষা স্থগিত: চলমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সব পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা।
ভুল প্রশ্ন সংশোধন ও মূল্যায়ন: পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে ভুল থাকায় তার যথাযথ সংশোধন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।
পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ: দুর্যোগের কারণে যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি বা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ প্রদান।
সরকারের অবস্থান ও বর্তমান পরিস্থিতি
১৫ জুলাই দুপুর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মহল এই বিষয়ে বেশ অনড়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ছাড়া দেশের অন্য কোনো শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষা স্থগিত করা হবে না। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দাবি করা হয়েছে, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং পরিবেশ আপাতত অনুকূলে আছে।শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন আশ্বস্ত করেছেন যে, পদার্থবিজ্ঞানের ভুল প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর (ফুল মার্কস) দেওয়া হবে এবং যেসব কেন্দ্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে, প্রয়োজনে সেখানে বিকল্প ব্যবস্থায় পরীক্ষা নেওয়া হবে। কিন্তু এই আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, ‘ফুল মার্কস’ তাদের সমস্যার সমাধান নয়, বরং জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
আন্দোলনের বিস্তার ও নিরাপত্তা
ঢাকার সায়েন্স ল্যাব ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন চট্টগ্রাম, বগুড়া, বরিশাল ও ময়মনসিংহের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা মঙ্গলবার বিকেলে একটি ‘লংমার্চ’ কর্মসূচি পালন করেছেন। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের ধস্তাধস্তির খবর পাওয়া গেছে। সরকার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, এই আন্দোলনে কিছু ‘বহিরাগত’ অনুপ্রবেশ করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি জাতীয় দুর্যোগের সময় পরীক্ষা নেওয়া কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এতে কেবল শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকিই বাড়ছে না, তাদের মানসিক চাপের মাত্রাও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। পরীক্ষার চেয়েও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের উচিত দ্রুত আলোচনায় বসে সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্য বিবেচনা করে দ্রুত কোনো সমন্বিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন। সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, পরীক্ষা জীবন গঠনের মাধ্যম, জীবন শেষ করার কারণ হওয়া উচিত নয়।