নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪
বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি খবরের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু তথ্যের এই অবাধ প্রবাহের আড়ালে গত কয়েক বছরে যে বিষবাষ্প দানা বেঁধেছে, তা হলো ‘ফেক নিউজ’ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য। ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন একজন সাধারণ ব্যবহারকারী মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারছেন, ঠিক তেমনিভাবে এক সেকেন্ডের ব্যবধানে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বা বানোয়াট তথ্য দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তথ্যের এই মহাসমুদ্রে কোনটি প্রকৃত সত্য এবং কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব, তা যাচাই করার ক্ষমতা না থাকায় সমাজে অস্থিরতা ও ভুল বোঝাবুঝি বাড়ছে। ডিজিটাল সাক্ষরতা বা তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি বর্তমান সময়ে নাগরিক সচেতনতার এক অপরিহার্য শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেক নিউজ বা ভুল তথ্য কেন আমাদের ডিজিটাল স্পেসকে এত বেশি দূষিত করছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এর পেছনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবসায়িক কারণ রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারীরা যা দেখতে পছন্দ করেন বা যে বিষয়ে তাদের আবেগ জড়িত, সেটিই তাদের সামনে বারবার আসে। এই সুযোগটিই কাজে লাগায় গুজব রটনাকারীরা। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে, ধর্মীয় উস্কানি দিতে অথবা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে হেয় প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়। আবার অনেক সময় কেবল ওয়েবসাইটের ক্লিক বাড়ানোর মাধ্যমে বিজ্ঞাপন থেকে অর্থ উপার্জনের নেশায় এক শ্রেণির অসাধু চক্র সংবেদনশীল ও বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দিয়ে খবর প্রচার করে। সাধারণ মানুষ যখন এই তথ্যের পেছনে থাকা অশুভ উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা আবেগের বশবর্তী হয়ে সেসব তথ্য শেয়ার করে ফেলে, যা ভুল তথ্যের এই দুষ্টচক্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাপ্ত যেকোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ইন্টারনেটে কোনো খবর দেখামাত্রই তা বিশ্বাস না করে বা না পড়েই শেয়ার করার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, সংবাদের উৎস যাচাই করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; কোনো অজ্ঞাত বা অপরিচিত ওয়েবসাইটের তথ্য কখনোই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, সংবাদের শিরোনাম দেখে উত্তেজিত না হয়ে ভেতরে বিস্তারিত পড়ুন, কারণ প্রায়ই দেখা যায় শিরোনাম ও মূল প্রতিবেদনের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকে। তৃতীয়ত, তথ্যের তারিখ ও সময় লক্ষ্য করুন, অনেক সময় বছর পুরনো ভিডিও বা ছবি বর্তমানে নতুন ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। চতুর্থত, গুগল বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে রিভার্স ইমেজ সার্চ ব্যবহার করে ছবির উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন। এছাড়া, দেশের প্রতিষ্ঠিত ফ্যাক্ট-চেক সংস্থাগুলোর সহায়তা নিন, যারা প্রতিনিয়ত ভাইরাল সংবাদের সত্যতা যাচাই করে। এসব ছোট ছোট অভ্যাস আপনার ডিজিটাল জীবনকে নিরাপদ রাখতে পারে।
ডিজিটাল সাক্ষরতা বা ডিজিটাল লিটারেসি আজকের দিনে আমাদের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ডিজিটাল সাক্ষরতা মানে কেবল স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করা নয়, বরং এটি ডিজিটাল মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যকে বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং তা ব্যবহারের সঠিক বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা। একজন ডিজিটালভাবে সাক্ষর ব্যক্তি কখনোই যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করেন না। তিনি জানেন যে একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন শেয়ার কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। ডিজিটাল সাক্ষরতা আমাদের সাইবার অপরাধ ও প্রতারণা থেকে রক্ষা করে, সেই সাথে ইন্টারনেটকে একটি নিরাপদ ও সুস্থির জায়গায় রূপান্তর করতে সাহায্য করে। যখন একজন মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার পর সেটিকে যৌক্তিক বিচার বিশ্লেষণ দিয়ে যাচাই করে, তখন সমাজে গুজব ছড়ানোর সুযোগ অনেক কমে যায়। তাই ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতার ওপর জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে বলা যায়, ভুল তথ্যের ভিড়ে সত্যের সন্ধান করা এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হলেও অসম্ভব নয়। আমরা যদি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিই, তবেই এই মহাবিপদ থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব। প্রতিটি সংবাদের পেছনে থাকা সত্য উদঘাটন করা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। পাবনা নিউজ ২৪ সব সময় বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধপরিকর এবং আমাদের পাঠকদের প্রতি আহ্বান রইল, গুজবে কান না দিয়ে, যাচাই না করে কোনো কিছু শেয়ার করবেন না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আপনাদের সামান্য সচেতনতা একটি বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয় রোধ করতে পারে। আসুন, আমরা সত্যের পথে থাকি, গুজবকে না বলি এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ অনলাইন পৃথিবী গড়ে তুলি। সত্যের জয় হবেই—যদি আমরা প্রতিটি ধাপে সচেতনতা ও সততার পরিচয় দিই।