নিউজ ডেস্ক | পাবনা নিউজ ২৪
শ্রাবণ মাসের শেষ ও ভাদ্রের শুরুতে বাংলার গ্রামীণ জনপদের প্রকৃতিতে এখন অন্যরকম এক কর্মব্যস্ততা। দিগন্তজোড়া মাঠের পর মাঠ সবুজ কার্পেট বিছানোর মতো আমন খেত নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন এ দেশের কোটি কৃষক। কাদা-জলে ভিজে হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় কৃষাণ-কৃষাণীরা রোয়াা আমন চারা রোপণে কিংবা পরিচর্যায় দিন কাটাচ্ছেন। আবহমান বাংলার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি হলেও, বর্তমান সময়ে এসে এই কৃষিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধছে নানা প্রশ্ন ও দুশ্চিন্তা। চালের বাজারমূল্য, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর চরম পরিবর্তনশীলতার কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও কৃষকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। পাবনা নিউজ ২৪-এর বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বাংলার কৃষির আগামীর পথচলা এবং সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে যেসব বিষয় কঠোরভাবে মেনে চলা জরুরি।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও কৃষিপ্রধান দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো মাঠের সঠিক উৎপাদন এবং তার সুষম সরবরাহ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে পাতে ভাত তুলে দেওয়াটাই যেন একটা বড় লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের প্রধান দুশ্চিন্তার জায়গা হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় চালের ঊর্ধ্বমুখী বাজারদর।কৃষকরা যখন মাঠে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সোনালী ফসল ফলান, তখন তাদের মুখে যেমন হাসি থাকে, ঠিক তেমনি সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির কারণে তাদের উৎপাদন খরচও বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে কৃষক যেমন ফসলের ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় থাকেন, তেমনি সাধারণ ক্রেতা বা ভোক্তারাও চড়া দামে চাল কিনতে গিয়ে হিমশিম খান। এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের জটিল সমীকরণ।পাবনা অঞ্চলের প্রবীণ কৃষকদের সাথে কথা বলে এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার আলোকে এটা স্পষ্ট যে, গতানুগতিক কৃষিপদ্ধতি দিয়ে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বাংলার কৃষিকে বাঁচাতে এবং সাধারণ মানুষের মুখের হাসি ধরে রাখতে নিচের বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেইনটেইন বা অনুসরণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি:
আমাদের দেশে দিন দিন আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে প্রতি বছর উর্বর কৃষিজমি হারাচ্ছি আমরা। এই সীমিত জমিতে বর্ধিত জনসংখ্যার খাবার জোগাতে হলে খরা, লবণাক্ততা ও বন্যা সহনশীল উচ্চফলনশীল ধানের জাতের চাষ বাড়াতে হবে। ব্রি ধান বা বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত আধুনিক জাতগুলো কৃষকদের মাঝে আরও দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে।কৃষকদের অন্যতম বড় গলার কাঁটা হলো সেচ কাজের জন্য ব্যবহৃত ডিজেল ও বিদ্যুতের চড়া দাম এবং সঠিক সময়ে সারের কৃত্রিম সংকট। সরকারের পক্ষ থেকে সার এবং বিদ্যুৎ বিলে যদি সময়মতো সরাসরি প্রণোদনা বা ভর্তুকি নিশ্চিত করা না যায়, তবে প্রান্তিক কৃষকরা চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। উৎপাদন খরচ কমানো গেলেই কেবল বাজারে চালের দাম একটি সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলার পরিবেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে। বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ খরচ বেড়ে গেছে। তাই রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির (যেমন: নদী, খাল ও বিল) সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
মাঠ থেকে উৎপাদিত ফসল ভোক্তার থালা পর্যন্ত পৌঁছাতে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল চক্রের একটি সিন্ডিকেট কাজ করে। কৃষক খেটে মরলেও ধানের সঠিক দাম পান না, আবার শহরে এসে সেই একই চাল দ্বিগুণ দামে কিনতে হয় সাধারণ মানুষকে। এই সিন্ডিকেট শক্তহাতে দমন করতে হবে। সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের পরিধি বাড়াতে হবে এবং ‘কোল্ড স্টোরেজ’ ও হিমাগার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে।শুধু ধান চাষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাংলার মাটিতে ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও পুষ্টিকর ফসলের চাষ বাড়াতে হবে। একই সাথে শ্রমিকের ঘাটতি মেটাতে কম খরচে কৃষি যন্ত্রপাতি (যেমন- কম্বাইন হারভেস্টার বা পাওয়ার টিলার) ভাড়া নেওয়ার সহজলভ্য ব্যবস্থা বা ‘মেশিনারি-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ মডেল মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।
সাধারণ মানুষের প্রধান আকুতি একটাই—খাদ্যের দাম যেন তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে। এজন্য নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে। আমন বা বোরো—প্রতিটি মৌসুমেই আগাম পূর্বাভাস, আবহাওয়া অনুকূল রাখার কৌশল এবং সঠিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলার কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক পরিকল্পনা এবং কৃষকবান্ধব নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগের ওপর। কৃষক বেঁচে থাকলেই কেবল বাঁচবে এ দেশের অর্থনীতি, আর সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা দূর হবে তখনই, যখন মাঠের সোনালী ফসল ন্যায্যমূল্যে প্রতিটি বাঙালির ঘরে পৌঁছে যাবে।