মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য, কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল (Black Hole) এবং অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব—এই শব্দগুলোর সাথে পরিচিত নন এমন মানুষ মেলা ভার। আর এই জটিল বিষয়গুলো নিয়ে যখনই বৈজ্ঞানিক আলোচনা হয়, বিশ্বজুড়ে তখন স্টিফেন হকিং বা রজার পেনরোজের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, হকিং বা পেনরোজের এই বিশ্বজয়ী গবেষণার পেছনে যাঁর আবিষ্কার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল, তিনি আমাদেরই পাবনার সন্তান—অধ্যাপক অমল কুমার রায়চৌধুরী।
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের আকাশে উজ্জ্বলতম এক নক্ষত্র অমল কুমার রায়চৌধুরী। আজ ‘পাবনা নিউজ ২৪’-এর বিশেষ আয়োজনে আমরা জানবো বিশ্ব কাঁপানো এই বাঙালি বিজ্ঞানীর গৌরবময় জীবন ও তাঁর অমর কীর্তির কথা।
পাবনার শিকড় ও প্রারম্ভিক জীবন
১৯২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় অমল কুমার রায়চৌধুরীর জন্ম হলেও তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল পাবনা জেলায়। তাঁর পিতা সুরেশচন্দ্র রায়চৌধুরী ছিলেন একজন গণিতের শিক্ষক। বাবার হাত ধরেই গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি অমল কুমারের এক গভীর ভালোবাসার জন্ম হয়।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৪২ সালে বিজ্ঞানে স্নাতক এবং ১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। অত্যন্ত মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর গবেষণার পথটি মসৃণ ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তিনি নিজের অদম্য জেদ আর প্রতিভায় বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
বিজ্ঞান দুনিয়ায় বিপ্লব: ‘রায়চৌধুরী সমীকরণ’ ($Raychaudhuri\ Equation$)
১৯৫৩ সালে যখন তিনি কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’ (IACS)-এ একজন সাধারণ গবেষক হিসেবে কাজ করছিলেন, তখন তিনি একক প্রচেষ্টায় এমন একটি সমীকরণ আবিষ্কার করেন যা পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দেয়। ১৯৫৫ সালে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ফিজিক্যাল রিভিউ’-তে তাঁর এই গবেষণা প্রকাশিত হয়, যা আজ বিশ্বজুড়ে “রায়চৌধুরী সমীকরণ” ($Raychaudhuri\ equation$) নামে পরিচিত।
স্টিফেন হকিং ও রজার পেনরোজের গবেষণায় এর ভূমিকা
আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে মহাবিশ্বের স্থান-কাল (Space-time) এবং সিঙ্গুলারিটি (Singularity) ব্যাখ্যার জন্য এই সমীকরণটি ছিল একটি যুগান্তকারী চাবিকাঠি।
পরবর্তীতে ষাটের দশকে প্রখ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রজার পেনরোজ যখন ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব (Penrose–Hawking singularity theorems) নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন তাঁরা অমল কুমার রায়চৌধুরীর এই সমীকরণটিকে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। রজার পেনরোজ স্বয়ং তাঁর বিভিন্ন লেকচারে অধ্যাপক রায়চৌধুরীর এই অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করেছেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক ও সাদামাটা জীবন
বিশ্বের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা যাঁর সমীকরণ নিয়ে গবেষণা করেন, সেই মানুষটি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, প্রচারবিমুখ ও সাদামাটা। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর পড়ানোর জাদুকরী শৈলী শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করতো।
তিনি শুধু একজন বড় বিজ্ঞানীই ছিলেন না, বরং বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ভালোবাসতেন। বাংলায় লেখা তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধগুলো আজও পাঠকদের অনুপ্রাণিত করে।
শেষ কথা
২০০৫ সালের ১৮ জুন এই মহান বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নোবেল পুরস্কারের মতো বড় কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হয়তো তিনি পাননি, কিন্তু বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকালের জন্য অমর হয়ে গেছে।
পাবনার মাটি যেমন যুগে যুগে বহু গুণী মানুষের জন্ম দিয়েছে, তেমনই অমল কুমার রায়চৌধুরী আমাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অহংকার। বিশ্বমঞ্চে পাবনার নাম উজ্জ্বল করা এই কালজয়ী বিজ্ঞানীর প্রতি পাবনা নিউজ ২৪ পরিবারের পক্ষ থেকে রইল গভীর শ্রদ্ধা ও সালাম।