মনে পড়ে কি সেই দিনগুলোর কথা? যখন গ্রামের মেঠো পথে ঢোলের শব্দ শুনলেই বুড়ো থেকে শিশু—সবাই একছুটে রওনা হতো মেলার দিকে? বাঁশের চটা আর চটের সামিয়ানা দিয়ে ঘেরা প্যান্ডেলের সামনে জমতো উপচে পড়া ভিড়। মাইকে ঘোষণা হতো—“আসুন, দেখে যান! জীবন্ত পুতুলের নাচ!” পর্দার আড়াল থেকে চিকন সুতোর টানে কাঠের পুতুলগুলো যখন জীবন্ত মানুষের মতো নেচে উঠতো, ডুগডুগির তালে তালে কথা বলে উঠতো, তখন দর্শকদের চোখে-মুখে ফুটে উঠতো এক অদ্ভুত বিস্ময়।
পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, বেড়া কিংবা সুজানগরের গ্রামীণ জনপদে একসময় বিনোদনের প্রধান খোরাকই ছিল এই পুতুল নাচ, লাঠি খেলা এবং কবিগান। কিন্তু আজ, ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে, সেই রঙিন দিনগুলো যেন কেবলই রূপকথা। স্মার্টফোনের স্ক্রিন আর ইন্টারনেটের নীল আলোয় নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে পাবনার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই লোকসংস্কৃতি।
আজ ‘পাবনা নিউজ ২৪’-এর বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আমরা ফিরে তাকাবো সেই সোনালী অতীতে এবং খোঁজার চেষ্টা করবো—কেন হারিয়ে গেল আমাদের নিজস্ব লোকজ বিনোদন?
পাবনার পুতুল নাচের সেই স্বর্ণযুগ
একসময় বৃহত্তর পাবনা অঞ্চল ছিল লোকসংস্কৃতির উর্বর ভূমি। বিশেষ করে সনাতন ও মুসলিম গ্রামীণ উৎসবগুলোতে, কিংবা শীতকালীন মেলাগুলোতে পুতুল নাচের দলগুলোর ডাক পড়তো সবার আগে। এই পুতুল নাচ কেবল বিনোদন ছিল না; এর মাধ্যমে তুলে ধরা হতো রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি কিংবা সামাজিক সচেতনতামূলক বার্তা, যেমন—যৌতুক প্রথা বন্ধ করা বা শিক্ষার গুরুত্ব।
পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া অঞ্চলের কিছু প্রবীণ পুতুল নাচ শিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, একসময় তাঁরা কাঠের ও কাপড়ের পুতুল নিজে হাতে তৈরি করতেন। পর্দার আড়ালে আঙুলের ডগায় সুতো বেঁধে পুতুল নাড়ানো এবং একই সাথে কণ্ঠ পরিবর্তন করে ডায়ালগ দেওয়া ছিল এক দীর্ঘ সাধনার বিষয়। একটি মেলায় পুতুল নাচের দল আসা মানে ছিল পুরো গ্রামে উৎসবের আমেজ তৈরি হওয়া।
স্মৃতির ক্যানভাস:
"ঢোলের কাঁঠি পড়তেই প্যান্ডেলের বাইরে মানুষের দীর্ঘ লাইন পড়ে যেত।
চার আনা, আট আনার টিকিটের জন্য চলতো হুড়োহুড়ি।
আজ সেই পুতুলও নেই, সেই মানুষও নেই।"
— আমজাদ আলী (৭০), পাবনার একজন প্রবীণ মেলা আয়োজক।
লাঠি খেলা ও কবিগান: বীরত্ব আর তর্কের হারিয়ে যাওয়া আসর
পাবনার লোকসংস্কৃতির আরেকটি বড় অনুষঙ্গ ছিল ‘লাঠি খেলা’। সাধারণত মহররম বা দুর্গাপূজার সময় পাবনার বিভিন্ন গ্রামে লাঠিয়ালরা ঢোলের তালে তালে তাঁদের শারীরিক কসরত ও বীরত্ব প্রদর্শন করতেন। প্রতিপক্ষের লাঠির আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে কীভাবে জয়ী হওয়া যায়, তা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতো।
এর পাশাপাশি ছিল ‘কবিগান’ বা ‘পাল্লা গান’। দুজন চারণ কবি মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ছড়া ও গানের মাধ্যমে একে অপরকে যুক্তি-তর্কে হারিয়ে দেওয়ার এই লড়াই ছিল দারুণ বুদ্ধিবৃত্তিক। চাটমোহরের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোতে একসময় সারারাত ধরে চলতো এই কবিগানের আসর।
কেন আজ নিশ্চুপ পাবনার মেলা প্রাঙ্গণ?
কালের বিবর্তনে পাবনার এই লোকজ ঐতিহ্যগুলো আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে:
- প্রযুক্তির আগ্রাসন: টেলিভিশন, সিনেমা এবং বর্তমান সময়ের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ার (টিকটক, ফেসবুক) যুগে মানুষ খুব সহজেই ঘরে বসে বিনোদন পাচ্ছে। ফলে মেলা বা পুতুল নাচের মতো প্রত্যক্ষ বিনোদনের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কমে গেছে।
- অর্থনৈতিক সংকট: পুতুল নাচ বা লাঠি খেলাকে পেশা হিসেবে নিয়ে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব নয়। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শিল্পীরা বাধ্য হয়ে রিকশা চালানো, দিনমজুরি বা অন্য পেশায় চলে গেছেন।
- মেলার রূপবদল: আধুনিক মেলাগুলো এখন আর লোকসংস্কৃতির কেন্দ্র নেই, সেগুলো মূলত বাণিজ্যিক পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। জুয়া বা অন্যান্য অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশের কারণে অনেক সময় ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
শেষ কথা: ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার আকুতি
সংস্কৃতি হলো একটি জাতির দর্পণ। আমাদের শিকড়কে যদি আমরা ভুলে যাই, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবে না। পাবনার এই হারিয়ে যাওয়া পুতুল নাচ ও লাঠি খেলাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক উৎসবে এই লোকশিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো, সরকারিভাবে তাদের ভাতার ব্যবস্থা করা এবং বছরব্যাপী লোকজ মেলার আয়োজন করার মাধ্যমে এই মৃতপ্রায় শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
মায়ার সুতোয় বাঁধা সেই কাঠের পুতুলগুলো যেন শুধু জাদুঘরের কাঁচের বাক্সে বন্দী না হয়ে পড়ে, তারা যেন আবার ফিরে আসে আমাদের মেঠো মঞ্চে—পাবনা নিউজ ২৪ পরিবারের পক্ষ থেকে এটাই আমাদের মূল দাবি।