Home লাইফস্টাইল সংস্কৃতি কালের সাক্ষী পোড়ামাটির শিল্প: পাবনার জোড়বাংলা মন্দির ও প্রাচীন স্থাপত্যের খোঁজে

কালের সাক্ষী পোড়ামাটির শিল্প: পাবনার জোড়বাংলা মন্দির ও প্রাচীন স্থাপত্যের খোঁজে

0
কালের সাক্ষী পোড়ামাটির শিল্প: পাবনার জোড়বাংলা মন্দির ও প্রাচীন স্থাপত্যের খোঁজে
পাবনার রাধানগরে অবস্থিত আঠারো শতকের পোড়ামাটির কারুকার্যখচিত ঐতিহাসিক জোড়বাংলা মন্দির।

ইটের পর ইট সাজিয়ে কীভাবে এক একটি গল্প বুনেছিলেন প্রাচীনকালের কারিগররা, তা দেখতে হলে আমাদের খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের পাবনা জেলার বুকেই পরম মায়ায় সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এমন কিছু প্রাচীন স্থাপত্য, যা দেখলে আজও চোখ জুড়িয়ে যায়। শত শত বছরের রোদ, বৃষ্টি, ঝড় আর ইতিহাসের নানা ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে এই স্মৃতিস্তম্ভগুলো আজও জানান দেয় আমাদের সমৃদ্ধ অতীতের কথা।

আজ ‘পাবনা নিউজ ২৪’-এর বিশেষ ভ্রমণে আমরা আপনাদের নিয়ে যাবো পাবনার তেমনি দুটি অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের কাছে—একটি হলো পাবনা শহরের রাধানগরের চমৎকার জোড়বাংলা মন্দির এবং অন্যটি চাটমোহরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন শাহী মসজিদ।

আপনি যদি ইতিহাস ভালোবাসেন কিংবা উইকএন্ডে ঘুরে বেড়ানোর জন্য কোনো সুন্দর জায়গার খোঁজ করেন, তবে এই প্রতিবেদনটি আপনারই জন্য।

টেরাকোটার অপূর্ব মহাকাব্য: পাবনার জোড়বাংলা মন্দির

পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লায় কালীবাড়ির পাশেই দেখা মিলবে দক্ষিণমুখী এই দোচালা স্থাপত্যের। স্থানীয়ভাবে এটি ‘জোড়বাংলা মন্দির’ (Jor Bangla Temple) নামে পরিচিত।

স্থাপত্যের গঠন ও ইতিহাস

বাংলো বা দোচালা ঘরের ছাদের মতো দেখতে দুটি ঘরকে পাশাপাশি জোড়া লাগিয়ে এই মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে বলেই এর নাম জোড়বাংলা। ইতিহাসবিদদের মতে, আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে (আনুমানিক ১৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) তৎকালীন পাবনার সেটেলমেন্ট অফিসার বা তহশিলদার ব্রজমোহন ক্রোড়ী এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

এই মন্দিরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর সামনের দেয়ালের টেরাকোটা বা পোড়ামাটির অলংকরণ। ইটের গায়ে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য, তৎকালীন সমাজজীবন, লতাপাতা এবং জ্যামিতিক নকশা। প্রাচীন বাংলার মৃৎশিল্পের এমন নিখুঁত ও চমৎকার কাজ এই অঞ্চলে সত্যিই বিরল।

ভ্রমণ টিপস: 
আপনি যদি ফটোগ্রাফি পছন্দ করেন, তবে দুপুরের আলো যখন মন্দিরের টেরাকোটার ওপর পড়ে, 
তখন চমৎকার সব ক্ল্যাসিক ছবি ফ্রেমবন্দী করতে পারবেন।

সুলতানি আমলের গৌরব: চাটমোহর শাহী মসজিদ

জোড়বাংলা মন্দির থেকে কিছুটা দূরে, চাটমোহর উপজেলা সদর হতে মাত্র এক কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ‘চাটমোহর শাহী মসজিদ’। মন্দিরটি যেমন হিন্দু স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন, তেমনই এই মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

এক খণ্ড ইতিহাস

১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরি ৯৮৯ সনে) সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তাঁর কাকশাল উপজাতির প্রধান মাসুম খানের নির্দেশে এই তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি নির্মিত হয়। এটি এই অঞ্চলের প্রাচীনতম মুসলিম স্থাপত্যগুলোর একটি। তুঘরা হরফে খোদাই করা একটি কালো পাথরের শিলালিপি একসময় এই মসজিদের সৌন্দর্য বাড়াতো, যা বর্তমানে ঢাকা জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। উচ্চ মাত্রার কারুকার্যময় মিহরাব এবং দেয়ালের ভেতরের খিলানগুলো আজও পর্যটকদের মোহিত করে।

কেন আজ আমাদের এই প্রাচীন সম্পদগুলোর দিকে তাকানো উচিত?

পাবনার এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো কেবল ইট-পাথরের দেয়াল নয়, এগুলো আমাদের সংস্কৃতির মূল শিকড়। দুঃখের বিষয় হলো, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচারের অভাবে এই সুন্দর জায়গাগুলো অনেকের কাছেই এখনও অজানা রয়ে গেছে।

যদিও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জোড়বাংলা মন্দির ও চাটমোহর মসজিদ সংস্কারের কিছু কাজ করেছে, তবে পর্যটকদের বসার স্থান, তথ্যকেন্দ্র এবং যাতায়াতের আরও উন্নত ব্যবস্থা করা গেলে এই স্থানগুলো বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ট্যুরিস্ট স্পট হয়ে উঠতে পারে।

শেষ কথা

আপনার ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে কোনো ছুটির দিনে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন পাবনার এই ঐতিহাসিক স্থানগুলো থেকে। আমাদের নিজেদের মাটির ইতিহাসকে জানা এবং তাকে বুকে ধারণ করার মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত আনন্দ।

পাবনার এই প্রাচীন ঐতিহ্যগুলো টিকে থাকুক আমাদের আগামী প্রজন্মের গর্বের প্রতীক হয়ে—পাবনা নিউজ ২৪ পরিবারের পক্ষ থেকে এই কামনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here