ভোর সাড়ে পাঁচটা। শহরের একটা বড় অংশ যখন ভোরের শীতল আমেজে কম্বল টেনে আর এক ঘুমে মগ্ন, ঠিক তখন পার্কের কংক্রিটের রাস্তায় নিয়মিত শোনা যায় কিছু জুতো আর মাটির ঘর্ষণের শব্দ। কারো কপাল বেয়ে নামছে ঘাম, কারো বুক ওঠানামা করছে দ্রুত শ্বাসে। দিনশেষে যখন তারা বাড়ি ফেরেন, তখন তাদের শরীরে এক অদ্ভুত ক্লান্তি থাকে ঠিকই, কিন্তু চোখে-মুখে থাকে এক ধরণের সতেজ তৃপ্তি।
ঠিক একই সময়ে,অন্য প্রান্তে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আরেক দল মানুষ মুচকি হাসছেন। তাদের মতে, এই সাতসকালে ঘুম নষ্ট করে শরীরকে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানেই হয় না। তারা ভাবেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা কি জিম করতেন? তারা কি প্রতিদিন নিয়ম করে ডাম্বেল তুলতেন? তাও তো তারা আশি-নব্বই বছর অবলীলায় বেঁচে ছিলেন। তাহলে এই আধুনিক যুগের ব্যায়ামের মাতামাতি কি শুধুই একটা ফ্যাশন বা কর্পোরেটদের তৈরি করা বড়সড় একটা ‘মিথ’?
ব্যায়াম বা ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ নিয়ে দুনিয়াটা ঠিক এই দুই ভাগে বিভক্ত। একদল মানুষের কাছে এটি জীবনের অক্সিজেনের মতো অপরিহার্য, আর অন্য দলের কাছে এটি কেবলই একটা হুজুগ। কিন্তু এই দুই দলের ভাবনার পেছনেই রয়েছে চমৎকার কিছু যুক্তি আর পাল্টা যুক্তি।
অলস মনের প্রথম যুক্তি: ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা তো জিম করতেন না”
ব্যায়ামকে যারা আধুনিক যুগের একটা কাল্পনিক ধারণা বা ‘মিথ’ মনে করেন, তাদের সবচেয়ে বড় ঢাল হলো ইতিহাস। যুক্তিটা শুনতে বেশ চমৎকার লাগে। হাজার বছর আগে মানুষ যখন বনে-জঙ্গলে থাকতো, তখন কি কোনো ইয়োগা ম্যাট বা ডাম্বেল ছিল? ছিল না। তাহলে এখন কেন সুস্থ থাকার জন্য জিমে গিয়ে টাকা খরচ করতে হবে বা জোর করে দৌড়াতে হবে?
এই যুক্তির পেছনে একটা মস্ত বড় ফাঁক রয়েছে। আদিম যুগের মানুষ জিম না করলেও, তাদের পুরো জীবনটাই ছিল একটা জীবন্ত জিমনেসিয়াম। বেঁচে থাকার জন্য তাদের প্রতিদিন মাইলের পর মাইল দৌড়াতে হতো, শিকার করতে হতো, গাছ থেকে ফলমূল পাড়তে হতো এবং হিংস্র পশুর হাত থেকে বাঁচতে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করতে হতো। বিজ্ঞানীদের মতে, একজন আদিম মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার হাঁটতো বা দৌড়াতো।
আর আমাদের আধুনিক জীবন কেমন? সকালে ঘুম থেকে উঠে গাড়িতে বা রিকশায় চড়ে অফিস, তারপর একটানা ৮-১০ ঘণ্টা ডেস্কে বসে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, আর রাতে ফিরে সোফায় বসে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিনেমা দেখা। আমাদের শরীর তৈরি হয়েছিল নড়াচড়া করার জন্য, কিন্তু আমরা একে বানিয়ে ফেলেছি একটা স্থবির ভাস্কর্য। তাই প্রাচীন মানুষের সাথে আধুনিক অলস জীবনযাত্রার তুলনা করাটাই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা।
অলস মনের দ্বিতীয় অজুহাত: ‘এক সপ্তাহ দৌড়েও ওজন কমলো না, এনার্জি বাড়ার গল্পটা আসলে মনের ভুল!’
“মানুষ তার নিজের অলসতাকে আড়াল করার জন্য সবচেয়ে সুন্দর সুন্দর অজুহাত তৈরি করতে পারে।” — হুমায়ূন আহমেদ
আমাদের অলস মন সবসময় খুব দ্রুত একটা ফলাফল দেখতে চায়। আমরা ভাবি, আজ রাতে বিশটা পুশ-আপ দিলে কাল সকালে আয়নার সামনে অলৌকিক কোনো পরিবর্তন দেখা যাবে। আর যখন সাতদিন পর ওজনের কাঁটা এক চুলও নড়ে না, তখন মন মুচকি হেসে বলে, “দেখলে তো? পুরো বিষয়টাই ভুয়া! এটা শুধুই একটা সাইকোলজিক্যাল চাতুরী।”
কিন্তু বিজ্ঞান এবং বাস্তবতা এই অলস যুক্তিকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দেয়। আমাদের শরীর কোনো রোবট নয়, এটি অত্যন্ত জটিল একটা বায়োলজিক্যাল মেশিন। আপনি যখন বছরের পর বছর স্থবির থেকে হঠাৎ একদিন ভোরে দৌড়ানো শুরু করেন, তখন প্রথম কয়েকদিন মাংসপেশির ভেতরের সূক্ষ্ম টিস্যুগুলো ছিঁড়ে যায়—বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘মাইক্রো-টিয়ার’। এই কারণেই প্রথম সপ্তাহে ওজন কমা তো দূরের কথা, উল্টো সারা শরীরে একটা তীব্র ব্যথা শুরু হয়। অলস দল এই শুরুর ধাক্কাটা দেখেই ভয় পেয়ে মাঠ ছাড়ে।
অথচ আসল ম্যাজিকটা শুরু হয় ঠিক এই বাধার দেয়ালটা পার হওয়ার পর। আপনি যখন অলস মনের অজুহাতকে পাত্তো না দিয়ে পথ চলতে থাকবেন, তখন শরীর বুঝে নেয় আপনি হার মানছেন না। ঠিক তখনই মস্তিষ্ক থেকে ‘এনডোরফিন’ এবং ‘ডোপামিন’ নামের হরমোন নিঃসৃত হতে শুরু করে, যাকে বলা হয় ‘হ্যাপি হরমোন’।
এই হরমোনগুলো ক্ষণস্থায়ী ডায়েটের মতো শুধু ওজন কমায় না, এগুলো সরাসরি মানুষের মানসিক চাপ এবং ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়। অর্থাৎ, ব্যায়ামের পর যে চনমনে এনার্জি পাওয়া যায়, তা কোনো কাল্পনিক মনের ভুল নয়; এটি ল্যাবরেটরিতে প্রমাণিত একদম খাঁটি জৈবিক সত্য। অলস মানুষগুলো এই হরমোনের আসল স্বাদ পাওয়ার আগেই হাল ছেড়ে দেয়, আর যারা টিকে থাকে, সুস্থতা তাদের নিয়ম করে ধরা দেয়।
অলস মনের শেষ সান্ত্বনা: ‘ভবিষ্যতে দেখা যাবে, এখন তো বেশ ভালোই আছি!’
“অলসতা হলো এমন এক অদৃশ্য ফাঁদ, যা বর্তমানকে আরামদায়ক করলেও ভবিষ্যৎকে পঙ্গু করে দেয়।” — সক্রেটিস
বাস্তবতার হিসাবটা আসলে খুব সোজা। ধরুন দুই বন্ধু—রাফি আর সাজিদ। রাফি প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ত্রিশ মিনিট ঘাম ঝরায়, হোক সেটা একটু জোরে হাঁটা বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ। অন্যদিকে সাজিদ ভাবে, এখন তো শরীর এক্কেবারে ফিট আছে, শুধু শুধু কষ্ট করার কী দরকার! অলস মন সাজিদকে সান্ত্বনা দেয়, “আরে ধুর, যখন রোগ হবে তখন দেখা যাবে।”
পরের পাঁচ বছরে হয়তো রাফি আর সাজিদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য চোখে পড়বে না। কিন্তু আসল খেলাটা শুরু হবে ১০ বছর পর, যখন তারা বয়সের পরের ধাপে পা দেবেন। সাজিদ হঠাৎ খেয়াল করবে সামান্য তিন তলার সিঁড়ি ভাঙলেই তার বুক ধড়ফড় করছে, অসময়ে পিঠ আর হাঁটুতে ব্যথা শুরু হয়েছে, আর কাজের এনার্জি কমে গেছে। অন্যদিকে নিয়মিত শরীরচর্চা করা রাফি তখনও ২৫ বছরের তরুণের মতো চনমনে।
চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, অলস জীবনযাপন মানুষের শরীরে নিঃশব্দে ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো মারাত্মক ব্যাধি ডেকে আনে। ব্যায়াম কেবল ওজন কমানোর জন্য নয়, এটি আমাদের শরীরের ভেতরের ইঞ্জিনকে সচল রাখার একমাত্র প্রাকৃতিক উপায়।
সিদ্ধান্ত এখন আপনার
দিনশেষে, ব্যায়াম কোনো বিলাসিতা বা আধুনিক ফ্যাশন নয়। এটি হলো আপনার নিজের শরীরের প্রতি আপনার নূন্যতম দায়িত্ব। প্রকৃতি আমাদের শরীরকে সচল রাখার জন্যই তৈরি করেছে, অচল করে বসিয়ে রাখার জন্য নয়। এখন সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আপনার—আপনি কি ভোরের তাজা বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে দিনটা শুরু করবেন, নাকি অলস যুক্তির জাল বুনে ভবিষ্যতের দিকে হেঁটে যাবেন?
আরও পড়ুন: [এয়ার ভাইস মার্শাল খাদেমুল বাশার: মুক্তিযুদ্ধের আকাশজয়ী বীর ও পাবনার অহংকার]