Home লাইফস্টাইল আগের গল্পে জীবন ছিল, এখন শুধুই ডার্ক থ্রিল: সস্তা অ্যাটাচমেন্টের যুগে আমরা কেমন পাঠক হচ্ছি?

আগের গল্পে জীবন ছিল, এখন শুধুই ডার্ক থ্রিল: সস্তা অ্যাটাচমেন্টের যুগে আমরা কেমন পাঠক হচ্ছি?

0
আগের গল্পে জীবন ছিল, এখন শুধুই ডার্ক থ্রিল: সস্তা অ্যাটাচমেন্টের যুগে আমরা কেমন পাঠক হচ্ছি?
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কাগজের বইয়ের চেয়ে এখন স্ক্রিনের আলোতেই বেশি ঝুঁকছেন আজকের পাঠকেরা। ছবি: সংগৃহীত


ফিচার ডেস্ক | পাবনা নিউজ ২৪

ইনস্টাগ্রামের নান্দনিক ছবি কিংবা ফোনের স্ক্রিনে পিডিএফ ফাইলের ভিড়ে বদলে গেছে আমাদের বই পড়ার চেনা অভ্যাস। আগের গল্পে যেখানে জীবনের গভীর শিক্ষা আর মায়া থাকত, আজকের ডার্ক রোম্যান্সের যুগে সেখানে জায়গা করে নিয়েছে সস্তা আবেগ। রুচির এই রূপান্তর আমাদের কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে?

সেদিন ঘরের পুরোনো বুকশেলফটা পরিষ্কার করতে গিয়ে ধুলোবালি মাখা কয়েকটা গল্পের বই হাতে এল। পাতাগুলো কেমন যেন হলদেটে হয়ে গেছে, কিন্তু উল্টাতেই চেনা সেই কাগজের গন্ধটা বুক ভরে জানান দিল—এখানে একটা সময় লুকিয়ে ছিল অন্য এক জগৎ। মনে পড়ে গেল, আগে একটা বই পড়ার পর সেই গল্পের চরিত্রগুলো, তাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলো দিনের পর দিন মনের ভেতর আঠার মতো লেগে থাকত। গল্প থেকে মানুষ জীবন শিখত।

অথচ আজ বুকশেলফের দিকে তাকালে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিডে স্ক্রোল করলে মনটা কেমন যেন খটকা খায়। আমাদের বই পড়ার অভ্যাস, বই চেনার ধরন আর গল্পের জগৎটাই যেন রাতারাতি বদলে গেছে।

বই কেনা এখন শুধুই ইনস্টাগ্রামের ছবি?


আজকাল বইমেলা বা বইয়ের দোকানে গেলে একটা দৃশ্য খুব চেনা লাগে। নতুন বই কেনা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই বই পড়ার চেয়ে টেবিলের এক কোণে সুন্দর করে কফি কাপের পাশে রেখে কিংবা নান্দনিক কোনো ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা ছবি তোলাই যেন মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বই এখন আর শুধু জ্ঞানের বা আবেগের মাধ্যম নয়, অনেকের কাছে এটি ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে নিজেকে ‘বুকিশ’ বা রুচিশীল প্রমাণ করার একটা ফ্যাশন বা ‘শো-অফ’। কাগজের বইয়ের পাতার পর পাতা ওল্টানোর যে নস্টালজিয়া, তা যেন হারিয়ে যাচ্ছে স্ক্রিনের আলোয়। এখন মানুষ কাগজের বইয়ের চেয়ে ফোনের স্ক্রিনে ই-বুক (e-Book) পড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। কিন্তু সেই স্ক্রিনের আলো কি সত্যিই বইয়ের সেই পুরনো মায়াটা ধরে রাখতে পারছে?

ডার্ক থিমের জোয়ার আর হারিয়ে যাওয়া ‘শিক্ষা’


সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছে গল্পের ভেতরে। একটা সময় ছিল যখন গল্পের বই মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ আর জীবনবোধকে নাড়া দিত। ভালো-মন্দের তফাত শেখাত। কিন্তু আজকের পাঠকদের বড় একটা অংশের পছন্দের তালিকায় চোখ বুলালে দেখা যায়, সবার ঝোঁক এখন ‘ডার্ক থিম’ বা ‘ডার্ক রোম্যান্স’ (Dark Romance)-এর দিকে।

রহস্য, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বা অন্ধকার জগতের গল্প ভালো হতেই পারে, কিন্তু খটকা লাগে তখনই যখন দেখা যায় এখনকার বেশিরভাগ গল্পে জীবনের কোনো গভীর বার্তা বা শেখার মতো কিছুই থাকছে না। একটা সস্তা আকর্ষণ বা ‘টক্সিক অ্যাটাচমেন্ট’ দিয়ে সাজানো হচ্ছে পুরো কাহিনী।

"আজকাল নীলক্ষেত বা বইমেলায় গেলে দেখা যায় সবাই এমন বই খুঁজছে যেটার প্রচ্ছদ দেখতে সুন্দর, যা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্টোরি দেওয়া যাবে। আর গল্পের ক্ষেত্রেও এখন টক্সিক রিলেশনশিপ বা ডার্ক থ্রিলারের ট্রেন্ড চলছে। আমাদের জেনারেশন হয়তো আগের মতো ধীরস্থির বা গভীর আবেগের গল্প পড়ার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে।" — রাফসান আহমেদ, শিক্ষার্থী।

যখন ট্র্যাজেডিও হয়ে যায় ভীষণ ‘নরমাল’


আগের দিনের গল্পে কোনো একটা বিচ্ছেদ বা ট্র্যাজেডি থাকলে পাঠক মন থেকে কাঁদত। চরিত্রের কষ্টটা নিজের মনে হতো। আর এখনকার গল্পে খুন, পরকীয়া, মানসিক অত্যাচার কিংবা ট্র্যাজেডিগুলো এত বেশি সস্তা আর সাধারণ (Normal) বানিয়ে ফেলা হয়েছে যে, পাঠকদের মনে আর কোনো গভীর অনুভূতির সৃষ্টি হয় না। কোনো তীব্রতা বা ইনটেনসিটি (Intensity) নেই বললেই চলে। সবকিছুতেই কেমন যেন একটা কৃত্রিমতা। আবেগগুলো এত দ্রুত আসে আর যায় যে, বই বন্ধ করার পাঁচ মিনিট পরেই পাঠক ভুলে যায় সে কী পড়েছিল।

"আগে একটা বই পড়া শেষ করে আমরা বন্ধুদের সাথে সেটা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতাম। গল্পটা মনের ভেতর গেঁথে থাকত। আর এখনকার ছেলেমেয়েরা বই পড়ে ফোনের আলোয়, খুব দ্রুত। বই থেকে জীবন শেখার দিনগুলো মনে হয় সত্যিই ফুরিয়ে আসছে।" — সালেহা বেগম (৫৮), অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা।

আমরা কেমন পাঠক হচ্ছি?


গল্পের এই পরিবর্তনের জন্য কিন্তু শুধু লেখকেরা দায়ী নন, দায়ী আমরা পাঠকরাও। কারণ, দিনশেষে ডিমান্ড যেমন থাকে, সাপ্লাইও তেমনই হয়। আমরা এখন সস্তা বিনোদন আর দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া উত্তেজনা খুঁজছি। একটা সময় যে পাঠক শরৎচন্দ্র, হুমায়ূন আহমেদ বা ক্লাসিক গল্প পড়ে বুক ফাটানো কান্নায় ভেঙে পড়ত, সেই পাঠক আজ স্ক্রিনের পাতায় শুধুই অন্ধকার আর টক্সিক ভালোবাসা খুঁজে বেড়াচ্ছে।

বইয়ের জগত এভাবে বদলে যাওয়াটা হয়তো সময়ের দাবি, কিন্তু রুচির এই অধঃপতন কি সত্যিই মেনে নেওয়ার মতো? ডার্কনেসের এই তীব্র মোহে পড়ে আমরা কি তবে গল্পের সেই আসল মায়া, জীবনবোধ আর শিক্ষাটাকেই চিরতরে হারিয়ে ফেলছি না? ভাবার সময় কিন্তু এখনই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here