Home ধর্ম ও জীবন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া ৩টি প্রাচীন উপাসনালয়: স্থাপত্যশৈলী আর বিশ্বাসের এক অপূর্ব নিদর্শন

ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া ৩টি প্রাচীন উপাসনালয়: স্থাপত্যশৈলী আর বিশ্বাসের এক অপূর্ব নিদর্শন

0
ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া ৩টি প্রাচীন উপাসনালয়: স্থাপত্যশৈলী আর বিশ্বাসের এক অপূর্ব নিদর্শন
স্পেনের কর্ডোভায় দশম শতাব্দীতে খলিফা আবদুর রহমান (নাসের) কর্তৃক নির্মিত ঐতিহাসিক ‘মদিনাতুল জোহরা’ শহরের রাজকীয় ধ্বংসাবশেষ, যা ইউনেস্কোর একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।

ঐতিহ্য ডেস্ক | পাবনা নিউজ ২৪

মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর স্থাপত্যশৈলীর সবচেয়ে বড় স্মারক হলো প্রাচীন উপাসনালয়গুলো। শতাব্দী প্রাচীন এসব মসজিদ, মন্দির বা গির্জাগুলো কেবল ধর্মীয় প্রার্থনার স্থানই ছিল না, বরং এগুলো ছিল তৎকালীন রাজবংশ, সভ্যতা এবং শিল্পকলার জীবন্ত দলিল। কালের বিবর্তনে, যুদ্ধ-বিগ্রহে কিংবা প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে অনেক উপাসনালয় আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ইতিহাসের পাতায় প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া ধ্বংসাবশেষের দেয়ালগুলো আজও আমাদের ফিসফিস করে শুনিয়ে যায় প্রাচীন কারিগরদের নিখুঁত স্থাপত্যশৈলী আর মানুষের গভীর বিশ্বাসের গল্প।

আজ আমরা আলোচনা করব বিশ্ব এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় হারিয়ে যাওয়া বা বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাওয়া এমন ৩টি প্রাচীন উপাসনালয় নিয়ে, যা একসময় মানুষের শ্রদ্ধা আর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

 হারিয়ে যাওয়া জলমগ্ন মন্দির: ভারতের ‘ডুবন্ত’ শিব মন্দির (Shettihalli Rosary Church)

প্রথমেই আমরা কথা বলব এমন একটি উপাসনালয় নিয়ে যা বছরের অর্ধেক সময় জলের নিচে থাকে আর বাকি অর্ধেক সময় সগৌরবে জেগে ওঠে। ভারতের কর্ণাটকের শেট্টিহাল্লিতে অবস্থিত এই ‘রোজারি চার্চ’ (বা স্থানীয়দের কাছে ডুবন্ত শিব মন্দিরের কাছাকাছি এক অনন্য ঐতিহাসিক কীর্তি)। ১৮৬০-এর দশকে ফরাসি মিশনারিদের দ্বারা নির্মিত এই গথিক স্থাপত্যের গির্জাটি গোরুর বাঁধ (Gorur Dam) নির্মাণের পর হেমাভতী নদীর প্লাবনে তলিয়ে যায়।স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে এটি ছিল এক অপূর্ব নিদর্শন। বর্তমানে বছরের বর্ষা মৌসুমে এই প্রাচীন উপাসনালয়টি সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং কেবল এর ওপরের অংশটি দৃশ্যমান থাকে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে এটি তার পুরো রাজকীয় কাঠামো নিয়ে জেগে ওঠে। এই ধ্বংসাবশেষটি দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করেন, যা মানুষের প্রাচীন বিশ্বাস ও আধুনিক প্রকৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।

 বাংলাদেশের বিস্মৃত ঐতিহ্য: বাগেরহাটের ‘দশ গম্বুজ’ জিন্দাপীর মসজিদ

ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভাসে ষাট গম্বুজ মসজিদের ছবি। কিন্তু বাগেরহাটের ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের ভেতরেই জিন্দাপীর কমপ্লেক্সে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের পাতায় প্রায় হারিয়ে যাওয়া ‘জিন্দাপীর মসজিদ’। পঞ্চদশ শতকে খান জাহান আলীর সমসাময়িক সময়ে নির্মিত এই মসজিদটি সুলতানি আমলের স্থাপত্যের এক অসাধারণ উদাহরণ।এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মূল মসজিদের চারকোণে রয়েছে ৪টি বৃত্তাকার বুরুজ বা মিনার। এর দেয়ালগুলোর পোড়ামাটির বা টেরাকোটার (Terracotta) নকশা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। কালের বিবর্তনে এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর চারপাশের অনেক অংশই মাটির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়। সুলতানি আমলের এই নিখুঁত ইটের কারুকাজ প্রমাণ করে দেয় যে, সে যুগে এই বাংলায় ধর্মীয় স্থাপত্য কতটা সমৃদ্ধ ছিল।

 মধ্যযুগের হারিয়ে যাওয়া রত্ন: স্পেনের কর্ডোভার প্রাচীন ‘আল-হাকাম’ সম্প্রসারণ (The Lost Architecture of Madinat al-Zahra)

দশম শতাব্দীতে স্পেনের কর্ডোভায় খলিফা আবদুর রহমান (নাসের) এবং তার পুত্র আল-হাকাম তৈরি করেছিলেন এক রূপকথার শহর ‘মদিনাতুল জোহরা’। এর ভেতরেই ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সুন্দর এবং জমকালো মসজিদ। ইতিহাসবিদদের মতে, এই মসজিদের স্তম্ভগুলো তৈরি করতে মার্বেল, সোনা এবং মূল্যবান রত্নপাথর ব্যবহার করা হয়েছিল।পরবর্তীতে গৃহযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এই পুরো শহর এবং তার ভেতরের উপাসনালয়টি মাটির নিচে প্রায় হারিয়ে যায়। মাত্র শতাব্দী খানেক আগে খননকার্যের মাধ্যমে এর ১% অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর খিলান এবং জ্যামিতিক নকশার স্থাপত্যশৈলী আজও আধুনিক স্থপতিদের স্তব্ধ করে দেয়। এটি মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি সংস্কৃতির এক প্রাচীন ঐতিহাসিক মিলনমেলা ছিল।

কেন এই প্রাচীন উপাসনালয়গুলো আমাদের সংরক্ষণ করা উচিত?

এই হারিয়ে যাওয়া উপাসনালয়গুলো কেবল ইট-পাথরের দেয়াল নয়। এগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের চিন্তাভাবনা, তাদের শিল্পমনস্কতা এবং বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। এগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়া মানে মানব ইতিহাসের একেকটি সোনালী অধ্যায় চিরতরে মুছে যাওয়া। বর্তমান প্রজন্মের উচিত এই প্রাচীন স্থাপত্যগুলোর ইতিহাস জানা এবং পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা।সময়ের নিয়মে মানুষ হারিয়ে যায়, সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, কিন্তু মানুষের রেখে যাওয়া স্থাপত্য আর বিশ্বাস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকে। শেট্টিহাল্লির ডুবন্ত দেয়াল, বাগেরহাটের জিন্দাপীর মসজিদের টেরাকোটা কিংবা মদিনাতুল জোহরার মার্বেলের খিলান—প্রতিটি স্থাপনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ মরণশীল হলেও তার তৈরি করা শিল্প ও বিশ্বাস অমর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here