আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে আমাদের সিংহভাগ সময়ই কাটে চেয়ারে বসে। অফিস ডেস্ক, ল্যাপটপের সামনে কিংবা ঘরের সোফায়—ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা বসেই পার করে দিই। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, একটানা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার এই অভ্যাস ধূমপানের মতোই ক্ষতিকর, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে ‘সিটিং ডিজিজ’ (Sitting Disease)।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বা একটানা বসে থাকার ফলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং স্থূলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে একটু সচেতন হলেই এই নীরব ঘাতক থেকে আমরা আমাদের মেরুদণ্ড ও হার্টকে সুরক্ষিত রাখতে পারি।
কেন একটানা বসে থাকা হার্ট ও মেরুদণ্ডের শত্রু?
হার্টের ক্ষতি: আমরা যখন দীর্ঘক্ষণ বসে থাকি, তখন শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। ফলে রক্তে চর্বি বা কোলেস্টেরল জমার প্রক্রিয়া তরান্বিত হয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
মেরুদণ্ডের বিপর্যয়: ভুল ভঙ্গিমায় (Slouching) দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পিঠ, ঘাড় এবং কোমরের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে মেরুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্রনিক ব্যাক পেইন বা কোমর ব্যথার সৃষ্টি হয়।
‘সিটিং ডিজিজ’ থেকে বাঁচার ৫টি সহজ ও কার্যকরী কৌশল
আপনার ডেস্ক জব বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কাজ পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও, নিচের ছোট ছোট অভ্যাসগুলো আপনাকে সম্পূর্ণ সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে:
১. ‘পোমোডোরো’ বা ২০-২০ নিয়ম মেনে চলুন
প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট একটানা বসে থাকার পর অন্তত ২ মিনিটের জন্য সিট থেকে উঠে দাঁড়ান। একটু হাত-পা টানটান (Stretching) করুন বা ঘরের মধ্যেই একটু হেঁটে আসুন। এতে রক্ত সঞ্চালন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
২. বসার সঠিক ভঙ্গি বা পোশ্চার (Posture) ঠিক রাখুন
চেয়ারে বসার সময় পিঠ বা মেরুদণ্ড যেন বাঁকা না থাকে। পিঠ সোজা রেখে চেয়ারের ব্যাকরেস্টের সাথে লাগিয়ে বসুন। প্রয়োজনে কোমরের পেছনে একটি ছোট কুশন ব্যবহার করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারের স্ক্রিন যেন চোখের একদম সমান্তরালে থাকে, যাতে ঘাড় বাঁকাতে না হয়।
৩. ‘অ্যাক্টিভ সিটিং’ বা সক্রিয় থাকার চেষ্টা
অফিসে ছোটখাটো কাজের জন্য নিজেকে সচল রাখুন। যেমন—সহকর্মীকে ইন্টারকম বা মেসেজে নক না দিয়ে নিজে হেঁটে তার ডেস্কে যান। ফাইল বা পানি নেওয়ার জন্য নিজেই উঠে দাঁড়ান। লিফটের পরিবর্তে মাঝেমধ্যে সিঁড়ি ব্যবহার করার অভ্যাস করুন।
৪. ডেস্ক স্ট্রেচিং (Desk Stretching)
চেয়ারে বসেই কিছু হালকা ব্যায়াম করা সম্ভব। মাঝে মাঝে ঘাড় ডানে-বামে ঘোরানো, কাঁধ পেছনের দিকে গোল করে ঘোরানো (Shoulder Shrugs) এবং বসে থাকা অবস্থাতেই পা সোজা করে পায়ের পাতা নাড়াচাড়া করা। এতে পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়।
৫. দৈনিক ৩০ মিনিটের ফিটনেস রুটিন
সারাদিন ডেস্কে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, দিনের যেকোনো একটা সময়ে (সকালে অথবা সন্ধ্যায়) অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি গতিতে হাঁটুন, ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ বা ইয়োগা করুন। এটি সারাদিনের বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব শরীর থেকে অনেকাংশে দূর করে দেয়।
শেষ কথা
শরীর সচল রাখার জন্যই তৈরি হয়েছে, স্থবির থাকার জন্য নয়। তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে শরীরকে একটু নড়াচড়া করার সুযোগ দিন। সুস্থ হার্ট এবং মজবুত মেরুদণ্ডের জন্য আজ থেকেই অলসতা ভেঙে কর্মক্ষেত্রেই শুরু হোক আপনার সুস্থতার অভ্যাস!