নিউজ ডেস্ক: পাবনা নিউজ ২৪
বিলম্বে বিচার পাওয়ার অর্থ হলো বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া” (Justice delayed is justice denied)—আইনশাস্ত্রের এই চিরন্তন সত্যটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। দেশের উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে নিম্ন আদালত—সবখানেই আজ মামলার পাহাড়। ২০২৬ সালে এসেও একটি সাধারণ দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলার রায় পেতে একজন সাধারণ নাগরিকের বছরের পর বছর, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে যুগের পর যুগ আদালতের বারান্দায় জুতো ক্ষয় করতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, কেন বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা এত সময়সাপেক্ষ? কেন সঠিক সময়ে বিচার মিলছে না এবং এই বিচারিক ধীরগতির পেছনে আসলে কারা দায়ী? আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা দেশের আইনি ব্যবস্থার এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনের মূল কারণ এবং এর জন্য দায়ী পক্ষগুলোর ওপর একটি চুলচেরা বিশ্লেষণ তুলে ধরছি।
মামলার পাহাড় ও বিচারক সংকটের তীব্র অনুপাত
বাংলাদেশে বিচারিক বিলম্বের সবচেয়ে বড় এবং কাঠামোগত কারণ হলো জনসংখ্যার তুলনায় বিচারকের সংখ্যার চরম অপ্রতুলতা।
অনুপাতের বিশাল ফারাক: বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অথচ এই বিশাল সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির জন্য সমগ্র দেশে উচ্চ ও নিম্ন আদালত মিলিয়ে বিচারকের সংখ্যা মাত্র দুই হাজারের কাছাকাছি। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য ৩০ থেকে ৪০ জন বিচারক থাকেন, সেখানে বাংলাদেশে এই অনুপাত অত্যন্ত নগণ্য।
অমানুষিক কাজের চাপ: একজন বিচারককে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ১০০টি বা তারও বেশি মামলার কার্যতালিকা (Cause List) সামলাতে হয়। ফলে প্রতিটি মামলার গভীরে গিয়ে বিস্তারিত শুনানি করা এবং দ্রুত রায় দেওয়া একজন মানুষের পক্ষে শারীরিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই কাঠামোগত ঘাটতি বিচারিক প্রক্রিয়াকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখছে।
ঔপনিবেশিক আমলের প্রাচীন আইন ও পদ্ধতিগত জটিলতা
আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনো ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি (Penal Code), ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি (Crimes Procedure Code) এবং ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ওপর ভিত্তি করে চলছে। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এই আইনগুলো বর্তমান ২০২৬ সালের ডিজিটাল ও আধুনিক অপরাধের বিচার করার জন্য অনেকটাই অনুপযুক্ত এবং জটিল।
সাক্ষী না আসা ও সমন জারির দুর্বলতা: ফৌজদারি মামলায় বছরের পর বছর পার হয়ে যায় শুধু সাক্ষীর অভাবে। পুলিশ সময়মতো আদালতে সাক্ষী হাজির করতে পারে না, কিংবা সমন জারি করার প্রাচীন পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে সাক্ষী জানতেও পারেন না যে তার শুনানির তারিখ কবে।
বারংবার সময় নেওয়ার সংস্কৃতি (Adjournment): আইনের ফাঁকফোকর গলে আইনজীবীগণ খুব সহজেই আদালত থেকে বারবার সময় বা ‘তারিখ’ চেয়ে নেন। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে মামলার শুনানি পেছানো হয়, যা বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে।
তদন্ত কর্মকর্তার অদক্ষতা ও পুলিশের অবহেলা
একটি অপরাধের সঠিক এবং দ্রুত বিচার নির্ভর করে তার সুষ্ঠু তদন্ত রিপোর্টের (Charge Sheet) ওপর। কিন্তু আমাদের দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া একটি অন্যতম বড় দুর্বলতার জায়গা।
তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা: আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও, পুলিশ বছরের পর বছর ধরে তদন্ত শেষ করতে পারে না।
দক্ষতার অভাব ও ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট: অনেক ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার আধুনিক ফরেনসিক, সাইবার বা অপরাধ বিজ্ঞানের ওপর সঠিক প্রশিক্ষণ থাকে না। ফলে তারা যে চার্জশিট তৈরি করেন, তাতে অসংখ্য আইনি দুর্বলতা থেকে যায়। এই দুর্বল রিপোর্টের কারণে আদালতে মামলা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বিচারক বাধ্য হয়ে আরও অধিকতর তদন্ত বা শুনানির নির্দেশ দেন, যা সময়কে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে আসলে কারা দায়ী?
বিচারহীনতা বা ধীরগতির এই চক্রের পেছনে একক কোনো পক্ষ দায়ী নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার সাথে জড়িত কয়েকটি পক্ষ এর জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী:
আইনজীবী সিন্ডিকেট: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু অসাধু আইনজীবী মক্কেলদের কাছ থেকে দিনের পর দিন ফি বা টাকা নেওয়ার উদ্দেশ্যে মামলা দ্রুত শেষ করতে চান না। তারা নানা অজুহাতে আদালতের কাছে সময় চেয়ে মামলা টিকিয়ে রাখেন।
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: অতীতে এবং বিভিন্ন সময়ে বিচার বিভাগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা বিচারকদের স্বাধীনভাবে ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার কারণে আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ আমজনতাকে।
ডিজিটালাইজেশনের অভাব: বিশ্বজুড়ে ই-কোর্ট বা ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থা চালু হলেও আমাদের দেশের আদালতগুলো এখনো কাগজের ফাইলের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। এক আদালত থেকে অন্য আদালতে নথি পৌঁছাতেই মাসের পর মাস সময় লেগে যায়।
ভোগান্তির শিকার সাধারণ মানুষ: সমাজ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব
এই ধীর বিচার প্রক্রিয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। জমিজমা সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি মামলা করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। “বাপের মামলার রায় সন্তান এসে পাচ্ছে”—এমন প্রবাদ এখন দেশের ঘরে ঘরে। বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের এই আস্থার সংকট সমাজে অপরাধ প্রবণতা ও নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মতো ভয়াবহ সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে।
সমাধানের পথ: কী করা উচিত?
১. বিচারকের সংখ্যা দ্বিগুণ করা: অতি দ্রুত বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে বিচারকের সংখ্যা অন্তত দ্বিগুণ করতে হবে।
২. আইনের আধুনিকায়ন ও সংস্কার: ব্রিটিশ আমলের কার্যবিধি সংশোধন করে সময় নেওয়ার (Adjournment) সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিতে হবে।
৩. ই-জুডিশিয়ারি বা ডিজিটাল কোর্ট: মামলার ফাইলিং, সমন জারি এবং সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা অনলাইনের আওতায় আনতে হবে।
৪. বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR): ছোটখাটো দেওয়ানি ও পারিবারিক মামলাগুলো আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার ওপর জোর দিতে হবে।
একটি সভ্য সমাজের মেরুদণ্ড হলো তার স্বাধীন এবং দ্রুত বিচার ব্যবস্থা। ২০২৬ সালের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ করতে হলে আইনি ব্যবস্থার এই কচ্ছপ গতিকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যদি মামলার জট কমানো না যায়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায়বিচার অধরাই থেকে যাবে।