Home কৃতী সন্তান পাটের তৈরি ‘সোনালী ব্যাগ’: পলিথিনের বিকল্প আবিষ্কারে মানিকগঞ্জের সন্তানের বিশ্বজয়

পাটের তৈরি ‘সোনালী ব্যাগ’: পলিথিনের বিকল্প আবিষ্কারে মানিকগঞ্জের সন্তানের বিশ্বজয়

0
পাটের তৈরি ‘সোনালী ব্যাগ’: পলিথিনের বিকল্প আবিষ্কারে মানিকগঞ্জের সন্তানের বিশ্বজয়
দেশীয় মেধা আর সম্পদের সঠিক ব্যবহারে কীভাবে বিশ্বজয় করা যায়, তার জীবন্ত উদাহরণ ড. মোবারক আহমদ খান।

নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪

সারা বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক এবং পলিথিন ব্যাগ। শত বছরেও মাটিতে না পচে এগুলো আমাদের উর্বর ফসলি জমি, নদী-নালা এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় এবং পলিথিনের পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরিতে এক অভাবনীয় জাদুকরী আবিষ্কার দেখিয়েছে বাংলাদেশ। পাটের সেলুলোজ থেকে হুবহু পলিথিনের মতো দেখতে পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব ব্যাগ আবিষ্কার করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশের গর্বিত বিজ্ঞানী এবং মানিকগঞ্জের কৃতী সন্তান ড. মোবারক আহমদ খান। তার আবিষ্কৃত এই বিশেষ ব্যাগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সোনালী ব্যাগ’ । সোনালী ব্যাগের আদ্যোপান্ত এবং পরিবেশ রক্ষায় এর গুরুত্ব নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।

মানিকগঞ্জের মাটির সন্তান ড. মোবারক আহমদ খানের পরিচিতি

পাটের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া এই বিজ্ঞানীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা মানিকগঞ্জ জেলায়। মানিকগঞ্জের সন্তান ড. মোবারক আহমদ খান বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী এবং বর্তমানে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (BJMC) প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। পাটের ওপর দীর্ঘ গবেষণার কারণে বিশ্বব্যাপী তাকে ‘পাট বিজ্ঞানী’ হিসেবেও চেনেন অনেকে। তিনি শুধু সোনালী ব্যাগই আবিষ্কার করেননি, বরং পাট থেকে ঢেউটিন (জুটিন), হেলমেট, টাইলস এবং ঘর সাজানোর নানা উপাদান তৈরি করে পাটের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।

কী এই ‘সোনালী ব্যাগ’ এবং কীভাবে এটি তৈরি হয়?

ড. মোবারক আহমদ খানের বছরের পর বছর গবেষণার ফল হলো এই সোনালী ব্যাগ। সাধারণ মানুষ প্রথম দেখায় এটিকে প্রচলিত ক্ষতিকারক পলিথিন ব্যাগ বলেই ভুল করবেন। কারণ এটি পলিথিনের মতোই চকচকে, মসৃণ এবং সমান টেকসই। তবে এর উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং প্রাকৃতিক।

প্রক্রিয়াজাতকরণ: পাট থেকে সেলুলোজ আলাদা করে বিশেষ বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সেটিকে পাতলা শিটে রূপান্তর করা হয়। এরপর সেই শিট কেটে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাগ তৈরি করা হয়। পাটের সোনালী রঙের সাথে মিল রেখে এবং পাটের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সোনালী ব্যাগ’।

কেন সোনালী ব্যাগ রূপকথার মতো পরিবেশবান্ধব?

পলিথিনের বিকল্প হিসেবে কাগজের ব্যাগ বা কাপড়ের ব্যাগ বাজারে থাকলেও সেগুলো পলিথিনের মতো পানি নিরোধক বা সব ধরনের ব্যবহারে উপযোগী নয়। কিন্তু সোনালী ব্যাগের বৈশিষ্ট্যগুলো সত্যিই চমৎকার:

শতভাগ পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব

সাধারণ প্লাস্টিক পলিথিন মাটিতে মিশে যেতে ৪০০ থেকে ৫০০ বছর সময় নেয়, যা মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। অন্যদিকে, সোনালী ব্যাগ মাটিতে ফেলে দেওয়ার পর মাত্র ২ থেকে ৩ মাসের (৬০-৯০ দিন) মধ্যে সম্পূর্ণভাবে পচে মাটির সাথে মিশে যায় এবং মাটির জন্য চমৎকার জৈব সারে পরিণত হয়।

 পানিতে দ্রবণীয় এবং জলজ প্রাণীর জন্য নিরাপদ

সোনালী ব্যাগ যদি কোনো কারণে নদী বা সাগরের পানিতে পড়ে, তবে এটি দীর্ঘ সময় পানিতে থাকলে গলে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ব্যাগে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান না থাকায় মাছ বা অন্যান্য জলজ প্রাণী এটি খেয়ে ফেললেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না।

পলিথিনের চেয়েও বেশি টেকসই

গবেষণায় দেখা গেছে, ড. মোবারক আহমদের আবিষ্কৃত এই সোনালী ব্যাগ সাধারণ পলিথিনের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি ওজন বহন করতে সক্ষম এবং এটি শতভাগ ওয়াটারপ্রুফ বা পানি নিরোধক। ফলে কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে যেকোনো ভারী জিনিস বহনে এটি অত্যন্ত উপযোগী।

বিশ্বমঞ্চে সোনালী ব্যাগ ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

ড. মোবারক আহমদ খানের এই আবিষ্কার কেবল বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষা করবে না, বরং দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে। এক সময় পাটকে বলা হতো বাংলাদেশের ‘সোনালী আঁশ’। কিন্তু প্লাস্টিকের আগ্রাসনে পাটের সুদিন হারিয়ে গিয়েছিল। সোনালী ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন সফল হলে পাটের সেই গৌরবময় দিন আবার ফিরে আসবে।বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে পাইলট প্রকল্পের আওতায় এই ব্যাগ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ (যেমন—যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত) বাংলাদেশ থেকে এই পরিবেশবান্ধব সোনালী ব্যাগ আমদানির জন্য গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণের এই বৈশ্বিক যুগে সোনালী ব্যাগ হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত।

বাণিজ্যিক উৎপাদনে চ্যালেঞ্জ ও আমাদের করণীয়

অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সোনালী ব্যাগের ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এখনো পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় এবং বড় আকারের মেশিনারি স্থাপন না হওয়ায় এর উৎপাদন খরচ সাধারণ পলিথিনের চেয়ে কিছুটা বেশি।

এই বৈশ্বিক আবিষ্কারকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে:

সরকারি ও বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে সোনালী ব্যাগের গণ-উৎপাদন (Mass Production) শুরু করতে হবে।

উৎপাদন খরচ কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

পলিথিন বর্জন করে দেশীয় এই আবিষ্কার ব্যবহারে সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here