নিউজ ডেস্ক: পাবনা নিউজ ২৪
৩০ জুন, ২০২৬
একসময় ধারণা করা হতো ডায়াবেটিস কেবল প্রবীণ বা বয়স্কদের রোগ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই ধারণা এখন সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে তরুণ ও যুবকদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (IDF) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন। আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর একটি বড় অংশই তরুণ প্রজন্ম। বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিস ধরা পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অলস জীবনযাপন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং বংশগত কারণে অল্প বয়সেই রক্তে সুগারের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক নিয়মে জীবনযাপন করলে অল্প বয়সেই ডায়াবেটিস হওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং আক্রান্ত ব্যক্তিরাও রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। নিচে রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণের ৫টি সহজ ও কার্যকরী উপায় আলোচনা করা হলো:
১. দৈনিক অন্তত ৩০-৪০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা ব্যায়াম
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব অল্প বয়সে ডায়াবেটিস হওয়ার প্রধান কারণ। অলস জীবনযাপনের ফলে শরীরে ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা কমে যায়। রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রতিদিন নিয়ম করে কায়িক পরিশ্রম করা।
প্রতিদিন সকালে বা বিকেলে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট দ্রুত হাঁটার (Brisk Walking) অভ্যাস করুন।
এছাড়া সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে পারেন। এতে শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীল হয় এবং রক্তে থাকা গ্লুকোজ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে সুগারের মাত্রা কমিয়ে আনে।
২. কার্বোহাইড্রেট ও চিনিযুক্ত খাবার পরিহার
আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত পরিমাণে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট (যেমন: অতিরিক্ত ভাত, আলু, ময়দা) এবং রিফাইনড সুগার বা চিনি থাকে, যা রক্তে সুগারের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।
রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে রিফাইনড চিনি, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, ফাস্টফুড এবং মিষ্টি খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
ভাতের পরিমাণ কমিয়ে খাদ্যতালিকায় লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি, টক ফল এবং আঁশযুক্ত (Fiber) খাবার যোগ করুন। আঁশযুক্ত খাবার হজম হতে সময় নেয়, ফলে রক্তে হঠাৎ করে সুগারের মাত্রা বাড়ে না।
৩. শরীরের ওজন ও পেটের চর্বি নিয়ন্ত্রণ
স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সাথে ডায়াবেটিসের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমলে তা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে। অর্থাৎ, শরীরে ইনসুলিন তৈরি হলেও তা রক্তের গ্লুকোজ কমাতে কাজ করতে পারে না।
- আপনার উচ্চতা অনুযায়ী বডি মাস ইনডেক্স (BMI) সঠিক মাত্রায় রাখার চেষ্টা করুন।
- পেটের মেদ বা চর্বি কমাতে চর্বিজাতীয় ও তৈলাক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। ওজন মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ কমাতে পারলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়।
৪. মানসিক চাপ (Stress) মুক্ত থাকা ও পর্যাপ্ত ঘুম
বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ যুগে তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস অনেক বেশি। অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে শরীরে ‘কর্টিসল’ এবং ‘গ্লুকাগন’ নামক হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। এই হরমোনগুলো রক্তে সুগারের মাত্রা সরাসরি বাড়িয়ে দেয়।
মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত ইয়োগা, মেডিটেশন বা পছন্দের কোনো শখের কাজ করতে পারেন।
এর পাশাপাশি প্রতিদিন রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিশ্ছিদ্র ঘুম অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের মেটাবলিজম নষ্ট হয়, যা সুগার বাড়িয়ে দেয়।
৫. নিয়মিত স্ক্রিনিং ও চিকিৎসকের পরামর্শ
ডায়াবেটিসকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। বাংলাদেশে আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেক মানুষই জানেন না যে তাদের ডায়াবেটিস আছে। তাই বয়স ৩০ পার হওয়ার পর থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি।
বছরে অন্তত একবার বা দুবার রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা (Fasting and Postprandial) এবং গত ৩ মাসের গড় সুগারের মাত্রা (HbA1c) পরীক্ষা করুন।
যদি পরিবারে বা বংশে মা-বাবার ডায়াবেটিস থাকে, তবে অল্প বয়স থেকেই নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। সুগার বর্ডারলাইনে বা প্রি-ডায়াবেটিস পর্যায়ে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চললে রোগটি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অল্প বয়সে ডায়াবেটিস হওয়া মানেই জীবনের শেষ নয়। বরং এটিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা উচিত। পাবনা অঞ্চলসহ দেশের সকল তরুণ ও যুবকদের প্রতি পরামর্শ—আজই অলসতা ভেঙে সচেতন হোন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন এবং একটি সুস্থ ও ডায়াবেটিস-মুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করুন।