সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বাংলাদেশেও ঘনঘন ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। মাটির নিচের এই আকস্মিক কম্পন আমাদের মনে এক অজানা আতঙ্ক তৈরি করে। বিজ্ঞান যেখানে ভূমিকম্পকে ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে, ইসলাম সেখানে একে মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ সতর্কবার্তা হিসেবে অবিহিত করে।পাবনা নিউজ ২৪-এর আজকের আয়োজনে আমরা জানবো—
ঘনঘন ভূমিকম্প হলে একজন মুমিন মুসলমান হিসেবে আমাদের ধর্মীয় ও জাগতিক করণীয় কী
ভূমিকম্প নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিপবিত্র কুরআনে ‘যিলযাল’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরাই নাজিল হয়েছে, যেখানে কিয়ামতের ভয়াবহ ভূমিকম্পের বিবরণ রয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:”যখন পৃথিবী তার প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে।” (সূরা যিলযাল, আয়াত: ১)রাসূলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, শেষ জামানায় ভূমিকম্পের আধিক্য ঘটবে। তাই ঘনঘন ভূমিকম্প হওয়া মানেই হলো আল্লাহ তাআলা আমাদের সতর্ক করছেন যেন আমরা পাপাচার ছেড়ে সঠিক পথে ফিরে আসি।
ভূমিকম্পের সময় ও পরে মুমিনের ধর্মীয় করণীয়
হঠাৎ ভূমিকম্প শুরু হলে বা ঘনঘন ভূমিকম্পের আভাস পেলে একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব হলো আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল উল্লেখ করা হলো:
১. বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তওবা করা: ভূমিকম্প মূলত মানুষের গুনাহের কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরণের সতর্কবার্তা। তাই বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়া এবং পাপাচার থেকে খাঁটি মনে তওবা করা উচিত
।২. মহান আল্লাহকে স্মরণ করা ও দোয়া পড়া: বিপদের সময় আল্লাহর সাহায্য চাওয়া মুমিনের প্রধান হাতিয়ার। ভূমিকম্পের সময় আল্লাহর মহানত্ব ও দয়ার কথা স্মরণ করে এই দোয়াটি পড়া যেতে পারে:$$\text{اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا…}$$(হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এর কল্যাণ ও এর মধ্যকার কল্যাণ প্রার্থনা করছি…)
৩. দান-সদকা বৃদ্ধি করা: ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হলো দান-সদকা। বিপদ-আপদ এবং আল্লাহর গজব থেকে বাঁচতে বেশি বেশি সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন ওলামায়ে কেরাম।৪. গুনাহের কাজ বর্জন করা: সমাজে অন্যায়, জুলুম, ব্যভিচার ও সুদ-ঘুষ বেড়ে গেলে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নেমে আসে। তাই ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে সব ধরণের অনৈসলামিক কাজ বর্জন করতে হবে।
ইসলাম ও বিজ্ঞান: জাগতিক সতর্কতা ও প্রস্তুতিইসলাম শুধু দোয়ার কথাই বলে না, পাশাপাশি আত্মরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করারও নির্দেশ দেয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)। তাই ভূমিকম্পের সময় কিছু বিজ্ঞানসম্মত জাগতিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. ঘরের ভেতরে থাকলে করণীয়:আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকুন।’Drop, Cover, and Hold On’ পদ্ধতি অনুসরণ করুন। অর্থাৎ, শক্ত কোনো টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নিন।জানালার কাচ, আলমারি বা ভারী আসবাবপত্র থেকে দূরে থাকুন
২. ঘরের বাইরে থাকলে করণীয়:বহুতল ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, বড় গাছ বা ওভারপাস থেকে দূরে কোনো খোলা জায়গায় অবস্থান নিন।যদি আপনি গাড়িতে থাকেন, তবে নিরাপদ স্থানে গাড়ি থামিয়ে ভেতরেই অপেক্ষা করুন।৩. বহুতল ভবনে থাকলে:ভূমিকম্পের সময় তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে লিফট ব্যবহার করবেন না।সিঁড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করা যাবে না, কারণ হুড়োহুড়িতেই বেশি মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়।উপসংহারভূমিকম্প কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি মহান আল্লাহর মহাশক্তির এক সামান্য নিদর্শন। ঘনঘন ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়। তাই আসুন, আমরা জাগতিকভাবে সচেতন ও সতর্ক থাকি এবং একই সাথে আধ্যাত্মিকভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেদের সমর্পণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন। আমিন।