আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রধান অংশ হলো খাওয়া-দাওয়া। একজন মুসলমান হিসেবে খাবারের টেবিলে বসার পর আমাদের প্রথম কাজই হলো ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) বলা। এটি কেবল একটি প্রচলিত নিয়ম বা অভ্যাস নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত গভীর ধর্মীয় গুরুত্ব এবং মনস্তাত্ত্বিক উপকারিতা।
পাবনা নিউজ ২৪-এর আজকের ফিচারে আমরা জানবো—খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে আমরা কী কী কল্যাণ লাভ করতে পারি।
১. খাবারে বরকত ও তৃপ্তি বৃদ্ধি পায়
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, যেকোনো ভালো কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম নিলে তাতে ‘বরকত’ বা কল্যাণ যুক্ত হয়। খাবারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে একবার কিছু সাহাবী এসে কম খাবারে তৃপ্ত না হওয়ার কথা জানালে তিনি বলেছিলেন, “তোমরা হয়তো আলাদা আলাদা খাও? সবাই একসঙ্গে বসো এবং আল্লাহর নাম (বিসমিল্লাহ) নাও, এতে তোমাদের খাবারে বরকত হবে।” (সুনানে আবু দাউদ)।
অনেক সময় দেখা যায় প্রচুর পুষ্টিকর খাবার খেয়েও মনের তৃপ্তি বা শরীরের পুষ্টি মিলছে না। খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বললে সেই খাবার অল্প হলেও তা শরীরে পূর্ণ তৃপ্তি ও বরকত এনে দেয়।
২. শয়তানের অংশীদারিত্ব থেকে সুরক্ষা
আমরা যখন আল্লাহর নাম না নিয়ে খেতে বসি, তখন আমাদের অজান্তেই সেই খাবারে শয়তান অংশ নেয়। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“মানুষ যখন ঘরে প্রবেশ করার সময় এবং খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, তখন শয়তান (তার সঙ্গীদের) বলে, ‘তোমাদের জন্য এখানে রাত্রিযাপন ও নৈশভোজের কোনো সুযোগ নেই।’ আর যখন সে প্রবেশকালে আল্লাহর নাম স্মরণ করে কিন্তু খাওয়ার সময় স্মরণ করে না, তখন শয়তান বলে, ‘তোমরা নৈশভোজের সুযোগ পেলে।'”
তাই নিজের খাবারকে শয়তানের স্পর্শ থেকে মুক্ত রাখতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা জরুরি।
৩. মনস্তাত্ত্বিক ও সচেতনতা (Mindfulness) বৃদ্ধি
বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব বলে, খাওয়ার আগে একটু থমকে দাঁড়িয়ে সচেতন হওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। ক্ষুধার তাড়নায় আমরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে বা অন্যমনস্ক হয়ে (যেমন: মোবাইল দেখতে দেখতে) খাওয়া শুরু করি। কিন্তু খাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে যখন আমরা মুখে ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক একটি ইতিবাচক সংকেত পায়। এটি আমাদের খাবারের প্রতি মনোযোগী করে তোলে, ফলে খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া সহজ হয় এবং হজমপ্রক্রিয়া উন্নত হয়।
৪. সাধারণ অভ্যাস যখন ইবাদতে পরিণত হয়
খাওয়া-দাওয়া মানুষের একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রয়োজন। কিন্তু একজন মুমিন যখন আল্লাহর নাম নিয়ে সুন্নাত মেনে খাওয়া শুরু করে, তখন তার এই জাগতিক কাজটিও একটি ইবাদতে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ, শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ বলার মাধ্যমে আপনার ক্ষুধা মেটানোর পাশাপাশি আমলনামায় সওয়াবও যুক্ত হতে থাকে।
শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে ভুলে গেলে করণীয়
মানুষ স্বভাববশতই ভুলোমনা। কোনো কারণে যদি খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে মনে না থাকে এবং খাওয়ার মাঝপথে তা মনে পড়ে, তবে ইসলামে তারও সুন্দর সমাধান রয়েছে। তখন এই দোয়াটি পড়তে হবে:
$$\text{بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ}$$
(বিসমিল্লাহি আউওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু)
অর্থ: আল্লাহর নামেই এর শুরুতে এবং শেষে। (আবু দাউদ)
উপসংহার
খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা মূলত আল্লাহর প্রতি এক ধরণের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। যিনি আমাদের এই রিজিক দিয়েছেন, খাওয়ার শুরুতে তাঁর নাম নেওয়া একজন কৃতজ্ঞ বান্দার প্রধান দায়িত্ব। তাই আসুন, আমরা নিজে খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলি এবং পরিবারের ছোটদেরও এই চমৎকার সুন্নাতটি অভ্যাসে পরিণত করতে সাহায্য করি।