নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪
৬ জুলাই ২০২৬
মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু শুভ্র সাদা বরফের চাদর। মাইনাস ডিগ্রির তীব্র ঠান্ডায় যেখানে মানুষের টিকে থাকাই দায়, সেখানে এক অদ্ভুত ও গা শিউরে ওঠা দৃশ্য উঁকি দেয় অ্যান্টার্কটিকার ম্যাকমুর্ডো ড্রাই ভ্যালি অঞ্চলে। ধবধবে সাদা টেইলর গ্লেসিয়ার বা হিমবাহের বুক চিরে অনবরত ঝরে পড়ছে টকটকে লাল রঙের তরল, যা দেখতে অবিকল তাজা রক্তের মতো! এই কারণে বিশ্বজুড়ে এই স্থানটি পরিচিত ‘ব্লাড ফলস’ বা ‘রক্তাক্ত জলপ্রপাত’ নামে।একটি পাঁচ তলা ভবনের সমান উঁচু এই জলপ্রপাতটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীদের কৌতূহল এবং সাধারণ মানুষের মনে নানা রহস্য ও ভয়ের জন্ম দিয়েছে। জনমানবহীন এই হিমশীতল মরুভূমিতে কেন এই রক্তাক্ত স্রোত, এর পেছনের বৈজ্ঞানিক সত্যটাই বা কী—তা নিয়ে আজকের এই বিশেষ আয়োজন।
আবিষ্কারের ইতিহাস ও প্রথম যুগের আতঙ্ক
১৯১১ সালে অস্ট্রেলিয়ান ভূতাত্ত্বিক এবং ভূগোলবিদ গ্রিফিথ টেইলর (Griffith Taylor) প্রথম এই অদ্ভুত জলপ্রপাতটি আবিষ্কার করেন। তাঁর নামানুসারেই এই হিমবাহটির নাম রাখা হয় ‘টেইলর গ্লেসিয়ার’।প্রথমবারের মতো যখন তিনি এবং তাঁর অভিযাত্রী দল এই বরফের পাহাড় থেকে লাল রঙের স্রোত বেয়ে পড়তে দেখেন, তখন তারা চরম আতঙ্কিত ও বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ এবং অনেক আদিবাসী বিশ্বাস করত, এটি কোনো অলৌকিক ঘটনা, কোনো অভিশাপ বা প্রকৃতির কোনো অশুভ সংকেত। এমনকি প্রাথমিক অবস্থায় গ্রিফিথ টেইলর নিজেও ধারণা করেছিলেন, বরফের নিচে হয়তো কোনো বিশেষ ধরণের লাল শৈবাল বা শ্যাওলা (Red Algae) রয়েছে, যার কারণে পানির রং এমন রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। তবে সেই যুগে উন্নত প্রযুক্তির অভাবে এর প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হয়নি।
বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান: রক্তের রহস্য উন্মোচন
দীর্ঘদিন ধরে এই লাল জলের রহস্য অনুদঘাটিত থাকার পর, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানীরা আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এর ওপর ব্যাপক গবেষণা শুরু করেন। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লেসিওলজিস্ট জেসিকা ব্যাজলি (Jessica Badgeley) এবং কলোরাডো ক্রায়োস্ফেরিক সায়েন্সের গবেষকদের যৌথ গবেষণায় আসল সত্যটি বেরিয়ে আসে।
২০১৭ সালে রাডার প্রযুক্তির (Radio-Echo Sounding) মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা টেইলর হিমবাহের ভেতরের একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করেন। তাতেই বেরিয়ে আসে এক অবিশ্বাস্য সত্য।
২০ লাখ বছরের অবরুদ্ধ প্রাচীন হ্রদ:
বিজ্ঞানীরা দেখেন, এই বিশাল বরফের স্তূপের প্রায় ১,৩০০ ফুট নিচে একটি প্রাচীন হ্রদ বা জলের উৎস লুকিয়ে রয়েছে। আজ থেকে প্রায় ২০ লাখ বছর (২ মিলিয়ন বছর) আগে যখন অ্যান্টার্কটিকার এই অঞ্চলে বরফ জমতে শুরু করে, তখন সমুদ্রের পানির একটি অংশ এই বিশাল হিমবাহের নিচে আটকা পড়ে যায়। যুগের পর যুগ ধরে এই হ্রদটি বাইরের আলো, বাতাস এবং সূর্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল।
লোহার মরিচা ও রাসায়নিক বিক্রিয়া:
এই অবরুদ্ধ হ্রদের পানিতে লবণের পরিমাণ সাধারণ সমুদ্রের পানির চেয়ে প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি। এত অতিরিক্ত লবণের কারণে মাইনাস পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও এই পানি জমে বরফ হয়ে যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পানির নিচে থাকা পাথুরে স্তর থেকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন বা লোহা ($Fe^{2+}$) পানিতে দ্রবীভূত হয়েছে। পানির এই স্রোতটি যখনই বরফের ফাটল দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে বাইরের পৃথিবীতে বেরিয়ে আসে, তখনই বাতাসে থাকা অক্সিজেনের ($O_2$) সংস্পর্শে আসে। আর তখনই ঘটে ম্যাজিক। লোহার সাথে অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় мгণেই তৈরি হয় আয়রন অক্সাইড (মরিচা), যার কারণে পানির রং সাথে সাথে টকটকে লাল হয়ে যায়। ঠিক যেভাবে আমাদের শরীরে থাকা আয়রনের কারণে রক্তের রং লাল দেখায়!
চরম ভাবাপন্ন পরিবেশ ও ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান
ব্লাড ফলসের রহস্য কেবল পানির রঙের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিজ্ঞানীদের মহাকাশ গবেষণার এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই অবরুদ্ধ হ্রদটিতে কোনো অক্সিজেন নেই, আলো নেই এবং এর তাপমাত্রা অত্যন্ত কম। তাসত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা এই তরল পরীক্ষা করে প্রায় ১৭ ধরণের ভিন্ন প্রজাতির অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন।
তীব্র লবণাক্ত ও অক্সিজেনহীন এই অন্ধকার পরিবেশে কীভাবে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো লাখ লাখ বছর ধরে বেঁচে আছে, তা ডার্টমাউথ কলেজের অণুজীব বিজ্ঞানী জিল মিকুকি (Jill Mikucki) বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি জানান, এই ব্যাকটেরিয়াগুলো সালফাইড এবং আয়রনের বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের শক্তি উৎপাদন করে বেঁচে থাকে।বিজ্ঞানীদের মতে, ব্লাড ফলসের এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ যেমন—মঙ্গল গ্রহ (Mars) বা বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপার (Europa) বরফের নিচেও ঠিক একইভাবে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব।
অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম: সাধারণ মানুষের জন্য ভ্রমণের সুযোগ কেমন?
ব্লাড ফলস বা রক্তাক্ত জলপ্রপাত নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় এবং অনন্য এক পর্যটন কেন্দ্র। তবে বিশ্বের অন্যান্য ট্যুরিস্ট স্পটের মতো এখানে চাইলেই সহজে যাওয়া যায় না।
চরম দুর্গম পথ:
ম্যাকমুর্ডো ড্রাই ভ্যালিতে পৌঁছানোর কোনো সড়ক পথ নেই। এখানে যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো নিউজিল্যান্ড বা চিলির লজিস্টিক বেস থেকে বিশেষ হেলিকপ্টার বা ক্রুজ শিপের (Expedition Cruise) মাধ্যমে যাওয়া।চরম নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে বেশ কিছু অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী ধনী পর্যটক অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের অংশ হিসেবে হেলিকপ্টারে করে দূর থেকে এই ব্লাড ফলসের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। শুভ্র সাদা বরফের পটভূমিতে এই লাল জলপ্রপাতের বৈপরীত্য চোখে দেখার অভিজ্ঞতা জীবনের অন্যতম সেরা রোমাঞ্চকর অনুভূতি বলে জানান পর্যটকেরা। তবে অ্যান্টার্কটিকার ব্লাড ফলস প্রকৃতির এমন এক সৃষ্টি, যা একসময় মানুষের মনে ভয়ের সঞ্চার করত, আজ তা বিজ্ঞানের আলোয় এক পরম বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। এটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃতির যেকোনো রহস্যের পেছনেই লুকিয়ে থাকে বিজ্ঞানের সুগভীর নিয়ম। ২০ লাখ বছর ধরে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এই রক্তের মতো লাল জলপ্রপাত আজও পৃথিবীর অন্যতম এক মহাজাগতিক ও আদিম আশ্চর্য হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।