নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪
০১ জুলাই, ২০২৬ |
আইন তৈরি হয় একটি দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। আর তাই যেকোনো দেশের আইন সাধারণত অত্যন্ত গম্ভীর এবং যৌক্তিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়। কিন্তু আপনি কি জানেন, বিশ্বের এমন কিছু দেশ আছে যেখানে এমন কিছু অদ্ভুত, হাস্যকর এবং আজব আইন চালু রয়েছে, যা শুনলে আপনি হাসবেন নাকি অবাক হবেন তা ভেবে পাবেন না? অনেক সময় এই অদ্ভুত আইনগুলো ভাঙার কারণে সাধারণ মানুষকে গুনতে হয় বিশাল অঙ্কের জরিমানা, এমনকি হতে পারে জেলেও!সাধারণ মানুষের কাছে অবাস্তব মনে হলেও এই আইনগুলো কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সংবিধানে একদম লিখিতভাবে টিকে আছে। আজ পাবনা নিউজ ২৪-এর এই বিশেষ আন্তর্জাতিক ফিচারে আমরা আলোচনা করব বিশ্বের এমন ৫টি অদ্ভুত ও বৈচিত্র্যময় আইন নিয়ে, যা আপনার সাধারণ জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি সমানভাবে বিনোদন জোগাবে।
কানাডা: জনসমক্ষে কয়েন বা খুচরা পয়সা দিয়ে বেশি দামি জিনিস কেনা অবৈধ
আমাদের দেশে কোনো দোকানে গিয়ে এক বা দুই টাকার কয়েন দিয়ে বড় অঙ্কের কেনাকাটা করতে গেলে দোকানদার হয়তো একটু বিরক্ত হন, কিন্তু এটি কোনো আইনি অপরাধ নয়। তবে উত্তর আমেরিকার উন্নত দেশ কানাডায় এই কাজটি করলে আপনি সরাসরি আইনের আওতায় পড়ে যেতে পারেন!
আইন ও রহস্য: কানাডার ‘কারেন্সি অ্যাক্ট’ (Currency Act) অনুযায়ী, আপনি বাজারে কেনাকাটা করার সময় খুচরা কয়েনের ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করতে পারবেন না। যেমন—আপনি যদি কোনো দোকানে গিয়ে ১০ ডলারের কোনো পণ্য কিনতে চান, তবে আপনি সম্পূর্ণ দামটি ১ বা ৫ সেন্টের কয়েন দিয়ে পরিশোধ করতে পারবেন না। বিক্রেতা চাইলে সেই কয়েন নিতে আইনত অস্বীকৃতি জানাতে পারেন এবং জোর করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
কেন এই আইন: মূলত বিক্রেতার সময় বাঁচাতে এবং বাজারে কাগজের নোটের বা ডিজিটাল ট্রানজেকশনের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতেই কানাডিয়ান সরকার এই অদ্ভুত আইনটি তৈরি করেছে।
সুইজারল্যান্ড: রাত ১০টার পর হাইকমোড বা টয়লেটে ফ্ল্যাশ করা নিষেধ!
ইউরোপের স্বর্গরাজ্য খ্যাত সুইজারল্যান্ড তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঘড়ির জন্য বিখ্যাত হলেও, এখানকার কিছু নাগরিক আইন অত্যন্ত কঠোর এবং অদ্ভুত। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো রাত ১০টার পর টয়লেটের ফ্ল্যাশ ব্যবহার না করা।
আইন ও রহস্য: সুইজারল্যান্ডের অ্যাপার্টমেন্ট বা বহুতল ভবনগুলোতে রাত ১০টার পর হাইকমোড বা টয়লেটে ফ্ল্যাশ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো অ্যাপার্টমেন্টে রাত ১০টার পর পুরুষদের দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করাও নিষেধ, কারণ এর ফলে যে শব্দের সৃষ্টি হয় তা প্রতিবেশীদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে!
কেন এই আইন: সুইজারল্যান্ড সরকার শব্দ দূষণ (Noise Pollution) রোধে এবং নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ ঘুমের নিশ্চয়তা দিতে অত্যন্ত কঠোর। তারা ফ্ল্যাশের শব্দকে এক ধরণের শব্দ দূষণ হিসেবে বিবেচনা করে। তাই রাত ১০টার পর টয়লেট ব্যবহার করলেও ফ্ল্যাশ করার জন্য আপনাকে সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে!
ভেনিস (ইতালি): সেন্ট মার্কস স্কয়ারে কবুতরকে খাবার দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
বিশ্বের অন্যতম রোমান্টিক শহর ইতালির ভেনিস। এখানকার ঐতিহাসিক ‘সেন্ট মার্কস স্কয়ার’ (St. Mark’s Square)-এ প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমান। এই সুন্দর চত্বরে শত শত কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দারুণ লাগলেও, ভুলেও যদি আপনি তাদের কোনো খাবার (যেমন মুড়ি, বিস্কুট বা শস্যদানা) দেন, তবে আপনাকে বিশাল অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে।
আইন ও রহস্য: ২০০৮ সাল থেকে ভেনিস সরকার সেন্ট মার্কস স্কয়ারে কবুতরকে খাবার দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কেউ এই আইন অমান্য করলে তাকে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫০,০০০ টাকা (৫০০ ইউরো) পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।
কেন এই আইন: কবুতরের মল বা বিষ্ঠা অত্যন্ত অম্লীয় (Acidic), যা ভেনিসের শত শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক মার্বেলের তৈরি ভাস্কর্য ও প্রাচীন ভবনগুলোর মারাত্মক ক্ষতি করছিল। তাছাড়া কবুতরের অতিরিক্ত সংখ্যার কারণে শহরে রোগবালাই ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল।
সিঙ্গাপুর: চুইংগাম আমদানি, বিক্রি এবং চিবানো সম্পূর্ণ বেআইনি
সিঙ্গাপুরকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল দেশ। আর এই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পেছনে রয়েছে একটি অদ্ভুত আইনের অবদান, তা হলো চুইংগাম নিষিদ্ধকরণ।
আইন ও রহস্য: ১৯৯২ সাল থেকে সিঙ্গাপুরে চুইংগাম আমদানি করা, দোকানে বিক্রি করা কিংবা জনসমক্ষে চিবানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ যদি গোপনে চুইংগাম চোরাচালান বা বিক্রি করার চেষ্টা করে, তবে তার সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত জেল এবং ১ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে! এমনকি সাধারণ কেউ রাস্তায় চুইংগাম চিবিয়ে ফেললে তাকেও মোটা অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়।
কেন এই আইন: অতীতে মানুষ চুইংগাম খেয়ে যেখানে-সেখানে, বিশেষ করে ট্রেনের দরজার সেন্সরে, পাবলিক বাসের সিটে এবং লিফটে আঠার মতো লাগিয়ে রাখত। এর ফলে সিঙ্গাপুরের কোটি কোটি টাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং শহর নোংরা হতো। এই কারণে সরকার চুইংগাম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দেয়।
সামোয়া (প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ): স্ত্রীর জন্মদিন ভুলে গেলে সরাসরি জেল!
সংসার জীবনে অনেক স্বামীই কাজের ব্যস্ততায় স্ত্রীর জন্মদিন ভুলে যান। এর জন্য বড়জোর স্ত্রীর রাগ বা অভিমান সহ্য করতে হয়। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র ‘সামোয়া’ (Samoa)-তে স্ত্রীর জন্মদিন ভুলে যাওয়া মানে সরাসরি পুলিশি হাজতবাস!
আইন ও রহস্য: সামোয়ার প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীর জন্মদিনের তারিখ ভুলে যান এবং সেদিন স্ত্রীকে শুভেচ্ছা না জানান, তবে স্ত্রী যদি থানায় গিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তবে পুলিশ স্বামীকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য। এই অপরাধের জন্য স্বামীকে কিছুদিনের জন্য জেলেও থাকতে হতে পারে।
কেন এই আইন: নারীদের অধিকার রক্ষা এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় রাখার এক অনন্য (এবং স্বামীদের জন্য কিছুটা ভীতিজনক) প্রয়াস হিসেবে এই আইনটি সেদেশে কার্যকর রয়েছে। তাই সামোয়ার পুরুষেরা ক্যালেন্ডারে সবার আগে স্ত্রীর জন্মদিন দাগিয়ে রাখেন!স্থান, কাল ও পাত্রভেদে মানুষের চিন্তাভাবনা এবং সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে—বিশ্বের এই অদ্ভুত আইনগুলো তারই প্রমাণ। আমাদের কাছে যা হাস্যকর বা অদ্ভুত মনে হচ্ছে, অন্য একটি দেশের শৃঙ্খলা রক্ষায় তা হয়তো অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তাই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভ্রমণের সময় শুধু আনন্দ করলেই হবে না, সেই দেশের আইনি কানুন সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি, না হলে সামান্য একটি চুইংগাম কিংবা টয়লেটের ফ্ল্যাশের কারণেও আপনার কপালে জুটে যেতে পারে জেলখানা!