নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪
০১ জুলাই, ২০২৬:
একটি শিশুর নিরাপদ ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। কিন্তু বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদেরকে একটি কঠিন ও অপ্রিয় প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হচ্ছে— “আমাদের দেশ কি শিশুদের সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য আসলেই উপযুক্ত?” বাহ্যিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমীকরণ একদিকে যেমন উজ্জ্বল, অন্যদিকে আমাদের শিশুদের শৈশব ও মানসিক-শারীরিক বিকাশের চারপাশটা যেন ক্রমান্বয়ে এক দমবন্ধকর ও অনিরাপদ বলয়ে রূপ নিচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান, বাজারের বিষাক্ত ভেজাল খাদ্য, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা, মা-বাবার অসচেতনতা এবং অর্থনৈতিক দারিদ্র্য—সব মিলিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
পাবনা নিউজ ২৪-এর আজকের বিশেষ ও বিশদ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরব সেই অন্ধকার দিকগুলো, যা আমাদের শিশুদের স্বাভাবিক শৈশবকে কেড়ে নিচ্ছে।
চলতি ২০২৬ সালের শিউরে ওঠা শিশু নির্যাতনের (Abuse) পরিসংখ্যান
চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ৬ মাসের মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। এই চলতি বছরের প্রথম অর্ধেকেই বাংলাদেশে প্রায় ৩,৪৫০ জনেরও বেশি শিশু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ধরণের নির্যাতন, শারীরিক সহিংসতা এবং গুরুতর অপব্যবহারের (Abuse) শিকার হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো ডিজিটাল মাধ্যমে বা সাইবার বুলিং এবং চাইল্ড পর্নোগ্রাফির শিকার হওয়া শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ঘরের ভেতরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কিংবা খোদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় শিক্ষকদের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাও সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে প্রতিনিয়ত। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার ফলেই এই গ্রাফ প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী।
বিষাক্ত ভেজাল খাদ্যের থাবা: শিশুরা কি খাচ্ছে নাকি বিষ গিলছে?
শিশুর শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য। কিন্তু বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় শিশুদের প্রতিটি প্রিয় খাবারই আজ মারাত্মক বিষাক্ত কেমিক্যালে ভরা।
- গুঁড়ো দুধে সীসা ও মেলামাইনের উপস্থিতি, চিপস ও চকোলেটে ক্ষতিকর ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার, বেকারির খাবারে টেক্সটাইল ডাই এবং বাজারে থাকা বিভিন্ন শিশুখাদ্যে ভারী ধাতুর মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি আজ প্রমাণিত।
- তাছাড়া আম, লিচু বা কলার মতো মৌসুমী ফলগুলোতে দেওয়া হচ্ছে কড়া মাত্রার প্রিজারভেটিভ ও কার্বাইড। এই বিষাক্ত ভেজাল খাবার প্রতিনিয়ত খাওয়ার ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ১০-১২ বছরের শিশুদের মাঝেই লিভার ফেইলিউর, কিডনি বিকল এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের বিস্তার ঘটছে, যা উন্নত বিশ্বে ভাবাই যায় না।
খেলার মাঠের অভাব ও বহুতল ভবনের বন্দিত্ব (খাঁচার শৈশব)
শহরাঞ্চলে শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ এখন একটি খাঁচার মতো। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরগুলোতে শিশুদের জন্য কোনো খেলার মাঠ অবশিষ্ট নেই।
পড়াশোনার চাপ এবং মাঠের অভাবে শিশুরা দিনের অধিকাংশ সময় পার করছে ফ্ল্যাট বাড়ির চার দেয়ালের বন্দিত্বে। এই একাকীত্ব ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা দূর করতে মা-বাবারা তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্টফোন বা ট্যাব। স্ক্রিন টাইমের এই আসক্তি শিশুদের মাঝে চরম মানসিক বিকৃতি, একাগ্রতার অভাব, স্থূলতা (Obesity) এবং মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো তীব্র ‘ডিজিটাল অটিজম’ বা মানসিক ব্যাধির জন্ম দিচ্ছে।
মুখস্থনির্ভর ও প্রতিযোগিতার ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের জ্ঞানার্জনের চেয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার এক অশুভ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে নামিয়ে দিয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চললেও বাস্তব অর্থে তা শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার চেয়ে মানসিক চাপ বেশি দিচ্ছে।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্কুলের ক্লাস, কোচিং, আর প্রাইভেট টিউটরের চাপে শিশুরা তাদের সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। পড়া না পারলে বা কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট না এলে শিক্ষকদের কটূক্তি এবং সহপাঠীদের সামনে অপমান করার মতো ঘটনা শিশুদের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে, যা অনেক সময় শিশুদের আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। শিক্ষার মান উন্নত দেশের মতো আনন্দদায়ক ও মনস্তাত্ত্বিক না হয়ে এখানে হয়ে উঠেছে এক প্রকার মানসিক ট্রমা।
মা-বাবার অসচেতনতা ও ভুল অভিভাবকত্ব (Parenting)
অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের এই বিপন্ন শৈশবের জন্য মা-বাবার অসচেতনতাও কম দায়ী নয়। বর্তমান যুগে মা-বাবা উভয়েই চাকরি বা ক্যারিয়ার নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, শিশুদের কোয়ালিটি টাইম (Quality Time) দিতে পারেন না।
অনেকে সন্তানের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করাকেই ভালোবাসা মনে করেন, কিন্তু তাদের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেন না। আবার অনেক অভিভাবক নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন। মা-বাবার পারিবারিক কলহ, চিৎকার এবং সন্তানের সামনে ডিভাইস নিয়ে মগ্ন থাকার কুপ্রভাব সরাসরি শিশুর অবচেতন মনে আঘাত করে, যা তাদের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্বকে উগ্র বা বিষণ্ণ করে তোলে।
দারিদ্র্যের কষাঘাত ও শিশুশ্রমের নির্মমতা
উন্নত দেশগুলোতে প্রতিটি শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব রাষ্ট্র অনেকাংশে কাঁধে নেয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও দারিদ্র্যের কারণে হাজার হাজার শিশু শৈশব চেনার আগেই উপার্জনের লড়াইয়ে নেমে পড়ে।
লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল, লেদ মেশিন কারখানা কিংবা ইটের ভাটায় শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। পেটের দায়ে পড়ালেখা ছেড়ে দেওয়া এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা সহজেই মাদক ব্যবসা, চুরি বা বিভিন্ন অপরাধ চক্রের খপ্পরে পড়ে যায়। দারিদ্র্য আমাদের দেশের একটি বিশাল অংশের শিশুদের মৌলিক শিক্ষা ও পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করে তাদের জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি আদর্শ ও শতভাগ উপযুক্ত পরিবেশ দিতে পারছে না। রাষ্ট্রকে যদি উন্নত করতে হয়, তবে সবার আগে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়তে হবে। খাদ্যে ভেজালকারীদের মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি, শিশু নির্যাতনকারীদের দ্রুততম সময়ে বিচার, শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দদায়ক করা এবং প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি মা-বাবাদেরও সচেতন হতে হবে, সন্তানকে ডিভাইসের বদলে নিজের সময় দিতে হবে। পাবনা নিউজ ২৪-এর পক্ষ থেকে আমরা আশা করি, রাষ্ট্র ও সমাজ সম্মিলিতভাবে আমাদের শিশুদের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ আগামী নিশ্চিত করবে।