নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের নাম ‘জলবায়ু পরিবর্তন’। বিশ্বজুড়ে শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংসের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং চরম আকার ধারণ করেছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, প্রকৃতি এখন তার ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। আর এই বৈশ্বিক সংকটের মুখে ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘনবসতির কারণে পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের মাশুল দিতে হচ্ছে এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে।আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র ধাক্কায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঠিক কতটা ঝুঁকির মুখে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের করণীয় কী।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি: প্রকৃতি যখন প্রতিশোধ নিতে শুরু করে
গত কয়েক দশকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশেষ করে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ার কারণে তাপ আটকে গিয়ে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে দ্রুত গতিতে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।প্রকৃতির এই ভারসাম্যের পরিবর্তন আজ আমাদের চারপাশে স্পষ্ট। অসময়ে বন্যা, তীব্র তাদদাহ (Heatwave), অতিরিক্ত খরা কিংবা হুট করে ধেয়ে আসা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়—এসবই প্রকৃতির এক ধরণের নীরব প্রতিশোধ। ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে এখন আর আগের মতো ছয়টি ঋতুর স্পষ্ট রূপ দেখা যায় না। বর্ষা আসছে দেরিতে, আবার যখন আসছে তখন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জনপদ। শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দুটোই কমে যাচ্ছে। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা আমাদের পুরো বাস্তুতন্ত্রকে (Ecosystem) হুমকির মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব
বাংলাদেশ কার্বন নিঃসরণের জন্য প্রায় দায়ীই নয় (শতাংশের হিসেবে ১ ভাগের চেয়েও অনেক কম), অথচ এর ক্ষতিকর প্রভাবের প্রথম সারিতে রয়েছে এই দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ মূলত তিন ধরনের বড় সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে:
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় সংকট
আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি আর মাত্র ১ মিটার বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। এর ফলে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও বরগুনার মতো জেলাগুলোর বিস্তীর্ণ অঞ্চল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যে লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ায় ওইসব অঞ্চলে কৃষি কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা
আইলা, সিডর, আম্পান, রেমাল কিংবা অতি সাম্প্রতিক বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়গুলোর তীব্রতা প্রমাণ করে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফ্রিকোয়েন্সি বা ঘনঘটা কতটা বেড়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ঘূর্ণিঝড়গুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী রূপ নিয়ে উপকূলে আঘাত হানছে। এতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।
নদীভাঙন ও ‘জলবায়ু শরণার্থী’
হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া এবং অসময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে দেশের প্রধান নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়ে তাদের ঘরবাড়ি ও শেষ সম্বলটুকু হারাচ্ছেন। এই বাস্তুহারা মানুষেরা বাধ্য হয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা পাবনার মতো বড় শহরগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন, যাদেরকে বলা হচ্ছে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ (Climate Refugees)।
কৃষি, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক আঘাত
আমাদের অর্থনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো কৃষি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুচক্র বদলে যাওয়ায় কৃষকেরা ধান, আলু বা অন্যান্য ফসল বোনার সঠিক সময় নির্ধারণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। হঠাৎ বন্যা বা দীর্ঘস্থায়ী খরা ফসলের মাঠ ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়ছে। অতিরিক্ত গরম এবং অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে পাবনাসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপদাহের কারণে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও করণীয়
ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ হাত গুটিয়ে বসে নেই। নিজস্ব অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’ (BCCTF) গঠনসহ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ (বদ্বীপ পরিকল্পনা) এর মতো দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে আরও কিছু পদক্ষেপ জরুরি:
উপকূলীয় বনায়ন: সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল। উপকূলজুড়ে আরও বেশি ম্যানগ্রোভ বা লবণাক্ততাসহিষ্ণু গাছের সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে।
নদী ড্রেজিং ও বাঁধ নির্মাণ: নদীগুলোর নাব্যতার সংকট দূর করতে নিয়মিত ড্রেজিং বা খনন করতে হবে এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার: কয়লা বা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ আদায়: আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে (COP) উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষতিপূরণের ফান্ড আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে।
বিশেষ সতর্কবার্তা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের সারসংক্ষেপ: জলবায়ু পরিবর্তন কেবল কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়, এটি আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। তবে মনে রাখতে হবে, সব দুর্যোগ বা আবহাওয়া পরিবর্তনের পেছনে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনই দায়ী নয়; আমাদের স্থানীয় পরিবেশ দূষণ, প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, এবং নির্বিচারে গাছ কাটা ও পুকুর-নদী ভরাট এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে। কোনো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয় বা পরিবেশজনিত রোগব্যাধি দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবেশবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।