নিউজ ডেস্ক ,পাবনা নিউজ ২৪
ক্রীড়া প্রতিবেদক: ২০২৬ ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে ফুটবল বিশ্ব দেখল এক ক্ল্যাসিক থ্রিলার। আমেরিকার মায়ামির ঐতিহ্যবাহী হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ে নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে গ্যারেথ সাউথগেটের থ্রি-লায়ন্সরা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর, অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুচাপের ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদ সুপারস্টার জুড বেলিংহামের জাদুকরী পারফরম্যান্সে জয় নিশ্চিত হয় ইংলিশদের। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়া নরওয়ের স্বপ্নের দৌড় অবশেষে থামল ফ্লোরিডার এই ফুটবল মঞ্চে।
রণকৌশল: সাউথগেটের ৪-৩-৩ বনাম সোলবাকেনের কাউন্টার-অ্যাটাকিং ৪-৫-১
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ডাগআউটে ছিল ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাসের লড়াই। ইংল্যান্ডের কোচ আক্রমণাত্মক ৪-৩-৩ ফর্মেশনে দল সাজান, যেখানে আক্রমণভাগের নেতৃত্বে ছিলেন হ্যারি কেইন, বুকায়ো সাকা এবং কোল পালমার। অন্যদিকে, নরওয়েজিয়ান ম্যানিফেস্টো ছিল বেশ স্পষ্ট—রক্ষণভাগ নিরেট রেখে আরলিং হালান্ড এবং মার্টিন অডেগার্ডের গতিকে কাজে লাগিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়া। কোচ স্ট্যাল সোলবাকেন ৫ সদস্যের শক্তিশালী মিডফিল্ড দিয়ে ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের দখল নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, যা প্রথমার্ধে বেশ সফলও হয়।
প্রথমার্ধের নাটকীয়তা ও নরওয়ের আকস্মিক আঘাত
ম্যাচের শুরুর ১০ মিনিটে ইংল্যান্ড বল পজেশনে এগিয়ে থাকলেও প্রথম বড় সুযোগটি তৈরি করে নরওয়ে। ৭ম মিনিটে ওডেগার্ডের একটি থ্রু পাস ধরে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন হালান্ড, তবে জন স্টোন্সের দারুণ ট্যাকেলে সে যাত্রা বেঁচে যায় ইংল্যান্ড।খেলার ৩৬ মিনিটে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো স্টেডিয়ামের ইংলিশ গ্যালারি। মাঝমাঠ থেকে ওডেগার্ডের বাড়িয়ে দেওয়া বল ধরে উইঙ্গার আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ বাম প্রান্ত দিয়ে এক দারুণ দৌড় দেন। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার কাইল ওয়াকারকে পরাস্ত করে তিনি একটি দূরপাল্লার ক্রস-কাম-শট নেন। বলটি বাতাসে সুইং করে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে ইংল্যান্ডের গোলপোস্টের দূরবর্তী কোণ দিয়ে জালে জড়ায়। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে মানসিকভাবে কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যায় থ্রি-লায়ন্সরা।
প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে বেলিংহামের একক জাদু এবং VAR বিতর্ক
পিছিয়ে পড়ার পর ইংল্যান্ড একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে। তবে নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আজের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। যখন মনে হচ্ছিল নরওয়ে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যাবে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির হন জুড বেলিংহাম।প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে (৪৫+২ মিনিটে) ডেক্লান রাইসের পাস থেকে বল পান বেলিংহাম। নরওয়ের তিন ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ে বোকা বানিয়ে ডি-বক্সের ভেতর থেকে ডান পায়ের এক নিখুঁত ফিনিশিংয়ে থ্রি-লায়ন্সদের সমতায় ফেরান তিনি। এর ঠিক দুই মিনিট পর হ্যারি কেইন নরওয়ের জালে আবার বল পাঠালেও ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির সাহায্যে দীর্ঘ ৩ মিনিট রিভিউ দেখার পর তা অফসাইডের কারণে বাতিল ঘোষণা করেন রেফারি। ফলে ১-১ সমতা নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধের স্নায়ুযুদ্ধ: দুই দলের রক্ষণভাগের বীরত্ব
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই ম্যাচের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। গোল করতে মরিয়া ইংল্যান্ড আক্রমণে ধার বাড়াতে এবারেশি এজে এবং ফিল ফোডেনকে মাঠে নামায়। ম্যাচের ৫৬ মিনিটে নরওয়ের স্ট্রাইকার আরলিং হালান্ড গোল করে বসেন, কিন্তু এবারও ভিএআর হ্যান্ডবলের কারণে গোলটি বাতিল করে দিলে ম্যাচ প্রাণ ফিরে পায়।পুরো দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ের গোলরক্ষক ওরজান নাইল্যান্ড যেন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ৭২ মিনিটে হ্যারি কেইনের বুলেট গতির শট এবং ৮১ মিনিটে কোল পালমারের ফ্রি-কিক অসাধারণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন তিনি। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে (Extra Time)।
অতিরিক্ত সময়ের রোমাঞ্চ: ‘বাজপাখি’ বেলিংহামের ব্রেস
নকআউট পর্বের অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ১০ মিনিট যেকোনো দলের জন্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক। ঠিক এই সময়েই নরওয়ের ডিফেন্সের একটি ছোট ভুলের চরম শাস্তি দেন বেলিংহাম। ম্যাচের ৯৩ মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে বদলি খেলোয়াড় মর্গান রজার্স নরওয়ের বক্সে একটি নিচু ও জোরালো শট নেন। নরওয়ে গোলরক্ষক নাইল্যান্ড বলটি প্রথম দফায় গ্রিপ করতে ব্যর্থ হলে ফিরতি বল বাতাসে থাকা অবস্থাতেই বাজপাখির মতো ছিটকে এসে ভলিতে জালে পুশ করেন বেলিংহাম। স্টেডিয়াম জুড়ে তখন ‘হেই জুড’ গানের গর্জন। ২-১ ব্যবধানে লিড নেয় ইংল্যান্ড।ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে নরওয়ে তাদের অল-আউট অ্যাটাক স্ট্র্যাটেজিতে যায়। ডিফেন্ডার তুলে নিয়ে অতিরিক্ত স্ট্রাইকার নামায় তারা। ১১৫ মিনিটে হালান্ডের একটি জোরালো হেড ইংল্যান্ডের গোলপোস্টে লেগে প্রতিহত হলে নিশ্চিত সমতা রক্ষা পায় ইংল্যান্ডের। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধান ধরে রেখেই সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে সাউথগেটের শিষ্যরা।
ম্যাচ পরবর্তী পরিসংখ্যান ও রেকর্ডের খেরোখাতা
এই ম্যাচটি শুধু ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালই এনে দেয়নি, তৈরি করেছে একাধিক নতুন রেকর্ড:
বেলিংহাম-কেইন জুটির কীর্তি: এই ম্যাচে জোড়া গোলের পর জুড বেলিংহাম এবং হ্যারি কেইন উভয়েই চলতি বিশ্বকাপে নিজেদের ৬টি করে গোল পূর্ণ করলেন। ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম কোনো একক বিশ্বকাপে দুই ইংলিশ খেলোয়াড় ৫ বা তার বেশি গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়লেন।
জর্ডান পিকফোর্ডের নতুন উচ্চতা: গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড বিশ্বকাপে নিজের ১৮তম ম্যাচ খেলে পিটার শিলটনের ঐতিহাসিক রেকর্ড ভেঙে দিলেন। তিনি এখন ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা গোলরক্ষক।
নরওয়ের গৌরবোজ্জ্বল বিদায়: হারলেও নরওয়ে এই বিশ্বকাপে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। গ্রুপ পর্ব থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত তাদের লড়াকু মানসিকতা ফুটবল বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সেমিফাইনালে সুপার ক্লাসিকো: আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড
কোয়ার্টার ফাইনালের এই অগ্নিপরীক্ষা পার করার পর ইংল্যান্ডের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী বুধবার আমেরিকার আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মহাকাব্যিক সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। ফুটবল প্রেমীরা ইতিমধ্যেই এই ম্যাচকে “ফাইনালের আগের ফাইনাল” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।