স্বাস্থ্য ও লাইফস্টাইল ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪:
আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে স্কিন কেয়ার শপ—সবখানেই এক ধরণের রঙিন, সুস্বাদু জেলির মতো ট্যাবলেটের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। এগুলোই হলো ‘বায়োটিন গামি’ (Biotin Gummies)। জম্পেশ বিজ্ঞাপন আর তারকাদের প্রচারণার কারণে অনেকেই ভাবেন, এই গামি খেলেই হয়তো টাক মাথায় জাদুর মতো নতুন চুল গজিয়ে উঠবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে চুল পড়া রোধে এই সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার ক্রেজ তৈরি হয়েছে। কিন্তু আসলেই কি টাক মাথায় চুল গজাতে বায়োটিন গামি কাজ করে? নাকি এটি কেবলই বিজ্ঞাপনী চমক? চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে—আসুন জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।
বায়োটিন আসলে কী এবং চুলে এর ভূমিকা
বায়োটিন হলো এক ধরণের পানি-দ্রবণীয় ভিটামিন, যা ‘ভিটামিন বি-৭’ বা ‘ভিটামিন এইচ’ নামেও পরিচিত। আমাদের চুল, ত্বক এবং নখের প্রধান উপাদান হলো ‘কেরাটিন’ (Keratin) নামক এক ধরণের প্রোটিন। বায়োটিন মূলত শরীরে এই কেরাটিন তৈরিতে উদ্দীপনা জোগায়। ফলে বায়োটিনের কারণে চুলের গোড়া শক্ত হয় এবং চুল সহজে ভেঙে যায় না।
টাক মাথায় কি নতুন চুল গজাতে পারে বায়োটিন গামি?
চিকিৎসকদের মতে, বায়োটিন গামি খেলেই টাক মাথায় নতুন চুল গজাবে—এই ধারণাটি পুরোপুরি সত্যি নয়। এর পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে:
- ১. এটি কেবল ঘাটতি পূরণ করে: আপনার শরীরে যদি বায়োটিনের ঘাটতি (Deficiency) থাকে, তবেই এই গামি খেলে চুল পড়া কমবে। কিন্তু বাস্তবে সুস্থ মানুষের শরীরে বায়োটিনের ঘাটতি খুব একটা দেখাই যায় না। কারণ আমরা প্রতিদিন যে ডিম, বাদাম, মিষ্টি আলু, মাংস বা ডাল খাই, তা থেকেই শরীর পর্যাপ্ত বায়োটিন পেয়ে যায়।
- ২. বংশগত বা অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া (টাক সমস্যা): পুরুষ বা নারীদের মাথায় যে স্থায়ী টাক পড়ে, তার প্রধান কারণ হলো বংশগত বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা (DHT হরমোনের প্রভাব)। হরমোনের কারণে যখন চুলের ফলিকল বা গোড়া স্থায়ীভাবে মরে যায়, তখন বায়োটিন গামি খেয়ে কোনো লাভ হয় না। এটি মরে যাওয়া ফলিকলকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে না।
- ৩. চুল গজানো বনাম চুল শক্ত করা: বায়োটিন মূলত বিদ্যমান চুলের স্বাস্থ্য ভালো করে, চুলকে ঘন ও মজবুত দেখায় এবং চুল ভাঙা কমায়। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ শূন্য বা টাক মাথায় নতুন করে চুল গজাতে (Hair Regrowth) সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে না।
অতিরিক্ত বায়োটিন গামি খাওয়ার কুফল
বাজারে পাওয়া যাওয়া বায়োটিন গামিগুলো খেতে মিষ্টি ও সুস্বাদু হওয়ায় অনেকেই চকলেটের মতো এগুলো বেশি পরিমাণে খেয়ে ফেলেন। অতিরিক্ত বায়োটিন খেলে হিতে বিপরীত হতে পারে:
- গামিতে থাকা অতিরিক্ত সুগারের কারণে ওজন বৃদ্ধি এবং দাঁতের ক্ষতি হতে পারে।
- শরীরে অতিরিক্ত বায়োটিন জমা হলে মুখে একজিমা বা মারাত্মক ব্রণের (Breakouts) সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- রক্ত পরীক্ষায় (যেমন থাইরয়েড টেস্ট) অতিরিক্ত বায়োটিনের উপস্থিতি ভুল রিপোর্ট বা ভুল ফলাফল দেখাতে পারে।
টাক মাথার প্রকৃত সমাধান কী?
আপনার যদি অতিরিক্ত চুল পড়ে বা টাক মাথার সমস্যা তৈরি হয়, তবে বায়োটিন গামির পেছনে টাকা খরচ না করে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ (Dermatologist)-এর পরামর্শ নিন। চিকিৎসকরা সাধারণত টাক মাথার জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কিছু চিকিৎসা দিয়ে থাকেন:
- মিনোক্সিডিল (Minoxidil): এটি মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।
- ফিনাস্টারাইড (Finasteride): এটি চুল পড়ার জন্য দায়ী ডিএইচটি (DHT) হরমোনকে ব্লক করে।
- পিআরপি থেরাপি (PRP Therapy): রোগীর নিজস্ব প্লাজমা মাথার ত্বকে ইনজেক্ট করে চুলের গ্রোথ বাড়ানো হয়।
- হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট: স্থায়ীভাবে চুল গজানোর আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি।
সমাপনী কথা
সংক্ষেপে বলা যায়, বায়োটিন গামি আপনার দুর্বল চুলকে কিছুটা মজবুত করতে পারলেও পুরোপুরি টাক মাথায় নতুন চুল গজানোর ক্ষমতা এর নেই। তাই চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হয়ে পুষ্টিকর খাবার খান এবং চুলের সঠিক চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সচেতনতা, রূপচর্চা ও আধুনিক জীবনধারার এমন সব তথ্যবহুল প্রতিবেদন সবার আগে পড়তে পাবনা নিউজ ২৪-এর সাথেই থাকুন।