রিপোর্ট ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪:
চলতি বছরের মাঝামাঝিতে এসে বিশ্ব অর্থনীতি এক নতুন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামের বড় পতন এবং সেই সাথে এশিয়ান ও আমেরিকান শেয়ার বাজারে চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর খাতের দরপতনের জেরে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আজ (২ জুলাই, ২০২৬) বিশ্ব বাজারে তেলের দাম চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। একই সাথে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের মন্দাভাবের ছোঁয়া লেগেছে এশিয়ার প্রধান প্রধান শেয়ার বাজারগুলোতেও। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এই সাম্প্রতিক ওঠানামা এবং এর পেছনের মূল কারণগুলো নিয়ে একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধস: স্বস্তিতে আমদানিকারক দেশগুলো
বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আজ টানা তৃতীয় দিনের মতো হ্রাস পেয়েছে। কাতারের দোহায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনার ইতিবাচক অগ্রগতির খবর সামনে আসতেই তেলের বাজারে এই পতন লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পর ‘স্ট্রেট অব হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে।আজকের বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড (Brent Crude) প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১.১০% কমে ৭০.৭৮ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে, যা গত ফেব্রুয়ারি মাসের পর সর্বনিম্ন। অন্যদিকে, আমেরিকার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুডের দাম ১.০৬% কমে প্রতি ব্যারেল মাত্র ৬৭.৮৫ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। এর পাশাপাশি ওপেকের (OPEC+) পক্ষ থেকে আগামী আগস্ট মাসে দৈনিক উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাব্য ঘোষণার পূর্বাভাসও তেলের দাম কমাতে ভূমিকা রাখছে। এই দরপতন বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে।
আমেরিকান বাজার ও ওয়াল স্ট্রিটের সতর্ক অবস্থান
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে প্রযুক্তি খাত, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের কারেকশন বা দরপতন হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রন টেকনোলজি এবং ইনটেলের শেয়ারের দাম এক ধাক্কায় যথাক্রমে ১০% ও ৯% পর্যন্ত পড়ে গেছে। মূলত এআই প্রযুক্তির পেছনে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় এবং সেই তুলনায় দ্রুত মুনাফা না আসার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা প্রফিট বুকিং বা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন।গত কার্যদিবসে আমেরিকার প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে ডাও জোন্স সামান্য কমে ৫২,৩০৫ পয়েন্টে এবং নাসডাক কম্পোজিট সূচক ০.৬৬% কমে ২৬,০৪০ পয়েন্টে নেমে স্থির হয়েছে। এর বাইরে বিনিয়োগকারীরা আমেরিকার আগামী কর্মসংস্থান রিপোর্টের (US Payrolls Data) দিকে তাকিয়ে আছেন, যার ওপর ভিত্তি করে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
ধাক্কা লেগেছে এশিয়ার শেয়ার বাজারে: দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রেডিং স্থগিত
আমেরিকার প্রযুক্তি খাতের এই মন্দার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এশিয়ার বাজারগুলোতে। আজ সকালে বাজার খোলার পরপরই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ার বাজার সূচক কোসপি (Kospi) ৫ শতাংশের বেশি আকস্মিক পতনের শিকার হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোরিয়া এক্সচেঞ্জকে সাময়িকভাবে ৫ মিনিটের জন্য লেনদেন স্থগিত বা ‘ট্রেডিং হাল্ট’ করতে হয়। দিনশেষে কোসপির পতন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.৯ শতাংশে।একই চিত্র দেখা গেছে জাপানের বাজারেও। সেমিকন্ডাক্টর খাতের ধসের কারণে জাপানের প্রধান সূচক নিক্কেই ২২৫ (Nikkei 225) আজ প্রায় ২% বা ১,২৪৪ পয়েন্ট হারিয়েছে। হংকং, অস্ট্রেলিয়া এবং চীনের সাংহাই সূচকও আজ লাল জোনে (পতন) অবস্থান করছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় ভারতের সেনসেক্স ও নিফটি সূচক কিছুটা রক্ষা পেয়েছে, কারণ তেল সস্তা হওয়া ভারতীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস ও বিনিয়োগকারীদের করণীয়
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাজারের এই ওঠানামা সাময়িক। একদিকে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ায় তেলের বাজার স্থিতিশীল হচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে, শেয়ার বাজারে এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি শেয়ারের যে বুদবুদ বা অতিরিক্ত মূল্যায়ন তৈরি হয়েছিল, তা এখন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। আগামীর বাজার পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী শান্তির ওপর। বিনিয়োগকারীদের এই মুহূর্তে তাড়াহুড়ো না করে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল খাতে নজর রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।