Home ফিচার দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলন ও দুর্নীতির শেকড়: ২০২৪-এর বাংলাদেশ বনাম বর্তমান ভারতের তারুণ্যের প্রতিবাদের সমীকরণ

দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলন ও দুর্নীতির শেকড়: ২০২৪-এর বাংলাদেশ বনাম বর্তমান ভারতের তারুণ্যের প্রতিবাদের সমীকরণ

0
দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলন ও দুর্নীতির শেকড়: ২০২৪-এর বাংলাদেশ বনাম বর্তমান ভারতের তারুণ্যের প্রতিবাদের সমীকরণ
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তারুণ্যের অধিকার আদায়ের দুই ভিন্ন কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়: বামে ঢাকার রাজপথে কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়োল্লাস এবং ডানে দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষা খাতের দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ।

নিউজ ডেস্ক : পাবনা নিউজ ২৪

দিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তাল। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস (NEET Paper Leak) কাণ্ড, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, এবং এর জেরে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের ব্যবহারের ঘটনায় ভারতের রাজধানী এক প্রকার অবরুদ্ধ। যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকারের দফায় দফায় বৈঠক চললেও সংকট কাটেনি। এই আন্দোলন কেবল কিছু পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়; বরং এটি গভীরে প্রোথিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের বিরুদ্ধে এক বড় বিস্ফোরণ।প্রতিবেশি দেশের এই আন্দোলনের সঙ্গে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভুত্থানের তুলনা করলে বেশ কিছু গভীর তাৎপর্য ও মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা সরাসরি কোনো দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির গতিপথ নির্ধারণ করে।

দুর্নীতির কালো ছায়া এবং দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার চালচিত্র

যেকোনো রাষ্ট্রে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোগত বড় বড় প্রকল্প বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে মাপা যায় না; এর আসল ভিত হলো মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও সুশাসন। ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম প্রমাণ করেছে যে, দুর্নীতির ঘুনপোকা কীভাবে একটি জাতির মেরুদণ্ডকে ভেতর থেকে ফাঁকা করে দিচ্ছে। যখন একটি দেশের লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থী প্রশ্নফাঁস বা নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে সিস্টেমের কাছে হেরে যায়, তখন মেধার সঠিক বিকাশ থমকে দাঁড়ায়। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে দুর্নীতি টিকলে দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে চরমভাবে ব্যাহত করে। মেধার অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে অযোগ্যতা ও দলীয়করণের প্রাধান্য দিলে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গন দুর্বল হয়ে পড়ে, যা ভারতের বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।

২০২৪-এর বাংলাদেশ বনাম ভারতের তারুণ্যের শক্তির জাগরণ

২০২৪ সালে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল সুরটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, কোটা সংস্কার এবং মেধার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; বরং গোটা জাতিকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল কীভাবে দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে হয়। ঠিক তেমনিভাবে, বর্তমান ভারতের যন্তর মন্তর ও রাজধানীর রাজপথে যুবসমাজ ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের (যেমন: ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-র নেতৃত্বাধীন আন্দোলন) উত্থান অনেকটা সেই চেতনারই প্রতিধ্বনি। বাংলাদেশে যেমন মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন না হওয়ার ফলে তারুণ্যের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছিল, আজ ভারতেও ঠিক একইভাবে শিক্ষা খাতের দুর্নীতি এবং কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তরুণেরা রাস্তায় নেমে প্রমাণ করেছে যে—ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে প্রতিবাদ করার সময় এসেছে।

দমনপীড়ন বনাম জনরোষ: ক্ষমতার অহংকার বনাম তারুণ্যের জেদ

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমনপীড়ন ও কঠোর অবস্থান আন্দোলনকে দমাতে পারেনি, বরং জনরোষকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল; ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতেও তার কিছুটা মিল দেখা যাচ্ছে। দিল্লিতে আন্দোলন দমাতে ব্যারিকেড, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং পুলিশি অ্যাকশনের পরও শিক্ষার্থীরা পিছু হটেনি। সরকার যতই ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট বা আইনি ব্যবস্থার কথা বলুক না কেন, কাঠামোগত আস্থার সংকট কাটানো সম্ভব হচ্ছে না। দুর্নীতি যখন সিস্টেমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে, তখন কেবল খয়রাতি বা সাময়িক পদক্ষেপে জনরোষ থামানো যায় না—তার জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন।

মেধার মুক্তি ও সুশাসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হলো দুর্নীতির বিস্তার। বাংলাদেশ হোক কিংবা ভারত—উন্নয়নের গতি সচল রাখতে হলে শিক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থাকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। আজকের তরুণ প্রজন্ম আর কেবল গতানুগতিক আশ্বাসে বিশ্বাসী নয়; তারা কাঠামোগত জবাবদিহিতা চায়। দিল্লির এই ছাত্র আন্দোলন এবং বিগত দিনে বাংলাদেশের তারুণ্যের বিপ্লব আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, মেধার মূল্যায়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই তার কাক্সিক্ষত ও টেকসই উন্নয়নে পৌঁছাতে পারে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here