Home পরিবেশ পাবনার আঞ্চলিক সমাচার: নদী ভাঙন রোধে পাউবোর মহাপরিকল্পনা ও চলনবিল অঞ্চলে আমন চাষের ধুম

পাবনার আঞ্চলিক সমাচার: নদী ভাঙন রোধে পাউবোর মহাপরিকল্পনা ও চলনবিল অঞ্চলে আমন চাষের ধুম

0
পাবনার আঞ্চলিক সমাচার: নদী ভাঙন রোধে পাউবোর মহাপরিকল্পনা ও চলনবিল অঞ্চলে আমন চাষের ধুম
পাবনার চলনবিল অঞ্চলের চাটমোহরে বর্ষার কাদা-পানিতে মাঠ জুড়ে দলবেঁধে আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকেরা।

নিউজ ডেস্ক ,পাবনা নিউজ ২৪

আষাঢ়ের শেষ লগ্নে এসে পাবনা জেলায় একযোগে শুরু হয়েছে উন্নয়ন ও কৃষি খাতের বিশাল কর্মযজ্ঞ। একদিকে বর্ষার আগ্রাসী রূপ থেকে জনপদ রক্ষা ও গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে মাঠ পর্যায়ে নেমেছেন জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা; অন্যদিকে, প্রকৃতির আশীর্বাদকে পুঁজি করে সোনালী স্বপ্নের বীজ বুনতে মাঠে নেমেছেন জেলার অন্নদাতারা। পাবনা জেলার অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট সংস্কার, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নদী ভাঙন রোধে চলমান মেগা প্রকল্প পরিদর্শন এবং চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর তথা চলনবিল অঞ্চলের আমন ধানের চারা রোপণের সমসাময়িক চিত্র নিয়ে পাবনা নিউজ ২৪-এর এই বিশেষ মাঠ প্রতিবেদন।

অবকাঠামো উন্নয়ন ও নদী ভাঙন রক্ষা: পাউবোর ঝটিকা পরিদর্শন

পাবনা জেলার ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে যমুনা, পদ্মা ও বড়াল নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন পয়েন্টে তীব্র নদী ভাঙন দেখা দেয়। এই বছর নদী ভাঙনের স্থায়ী সমাধান এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক সচলতা বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সম্মিলিতভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট সংস্কারে বিশেষ জোর

বর্ষার ভারী বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার অভ্যন্তরীণ কাঁচা ও আধা-পাকা রাস্তাগুলোর যে ক্ষতি হয়েছিল, তা দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পাবনা সদরসহ সুজানগর ও চাটমোহর এলাকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক পরিদর্শন করেন। কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এবং কৃষিপণ্য সহজে জেলা শহরে পৌঁছানোর সুবিধার্থে ভাঙাচোরা রাস্তাগুলো দ্রুত সংস্কার বা পুনর্বাসন করা হচ্ছে।

নদী ভাঙন রোধে ‘পাউবো’র তদারকি ও ব্লক ফেলা প্রকল্প

পাবনার বেড়া, সুজানগর এবং ঈশ্বরদী অঞ্চলের নদী তীরবর্তী মানুষের প্রধান আতঙ্ক নদী ভাঙন। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) স্থানীয় প্রকল্পের অধীনে সিসি ব্লক স্থাপন এবং জিও ব্যাগ ফেলার কাজ পুরোদমে চলছে।সম্প্রতি পাউবোর ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ পরিদর্শক দল প্রকল্প এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে কর্মকর্তারা জানান, “কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কোনো প্রকার আপস করা হবে না। বর্ষার পানি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো সুরক্ষিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।” এই পরিদর্শনের ফলে স্থানীয় নদী তীরবর্তী মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।

চলনবিল অঞ্চলের কৃষি আপডেট: আমন ধান রোপণে ব্যস্ত কৃষকেরা

বর্ষার নতুন পানি আসার সাথে সাথেই পাবনার বিখ্যাত চলনবিল অধ্যুষিত তিন উপজেলা—চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর-এর বিস্তীর্ণ মাঠ এখন উৎসবমুখর। দীর্ঘ খরা ও তাপদাহের পর আষাঢ়ের চেনা বৃষ্টি আসায় এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।

উর্বর পলি মাটিতে আমন চাষের ধুম

চলনবিল অঞ্চলের মাটি আমন ও বোরো চাষের জন্য অত্যন্ত উর্বর। বর্তমানে এই অঞ্চলের কৃষকেরা বীজতলা থেকে আমন ধানের চারা (বিশেষ করে বোনা ও রোপা আমন) তুলে মূল জমিতে রোপণের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকদের এই ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। কেউ জমি চাষ দিচ্ছেন, কেউ চারা তুলছেন, আবার কেউ সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করছেন।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তি

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর অঞ্চলে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আমন চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।

বন্যা সহনশীল জাতের ব্যবহার: বন্যা বা আকস্মিক ডুবে যাওয়া থেকে ফসল বাঁচাতে এবার স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্রি ধান-৫১, ব্রি ধান-৫২ সহ বিভিন্ন আধুনিক বন্যা সহনশীল জাতের বীজ বিতরণ করা হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের পরামর্শ: কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করছেন এবং কৃষকদের সঠিক সময়ে সুষম সার ব্যবহার ও পোকা-মাকড় দমনে ‘পার্চিং’ পদ্ধতির মতো পরিবেশবান্ধব কৌশল ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন।

কৃষকদের প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

ভাঙ্গুড়া উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবার সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় সেচ খরচ অনেকটাই বেঁচে গেছে। তবে সার ও কীটনাশকের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা। যদি কোনো বড় ধরনের আগাম বন্যা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটে, তবে চলনবিল অঞ্চলে এবার আমন ধানের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছেন স্থানীয় চাষিরা।একটি অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সমৃদ্ধ কৃষি। পাবনা জেলায় বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী রক্ষা বাঁধের কাজ এবং গ্রামীণ সড়ক সংস্কার সঠিক সময়ে শেষ হলে গ্রামীণ জনপদে স্বস্তি ফিরবে। একই সাথে চলনবিলের কৃষকদের যদি সরকারি প্রণোদনা ও সঠিক বাজার মূল্য নিশ্চিত করা যায়, তবে পাবনার গ্রামীণ অর্থনীতি দেশের সামগ্রিক জিডিপিতে এক বড় অবদান রাখবে। প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের এই যৌথ তৎপরতা আগামী দিনগুলোতে পাবনাকে একটি আদর্শ ও উন্নত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here