চলনবিল ও চাটমোহরের প্রত্যন্ত জনপদে কুমারী মেয়েদের হাত ধরে টিকে থাকা এক অনন্য উৎসবের না-বলা গল্প।
পাবনা সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি, পাবনা নিউজ ২৪: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের কথা সবার জানা। কিন্তু নদী ও বিলবেষ্টিত পাবনা জেলার বুকে এমন এক লোকউৎসবের জন্ম হয়েছিল, যা পুরো বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। বলছি পাবনার ঐতিহ্যবাহী ‘ভাঁজো উৎসব’-এর কথা। বিশেষ করে পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া এবং চলনবিল সংলগ্ন অঞ্চলের গ্রামীণ নারীদের কাছে এটি ছিল একসময় আনন্দের প্রধান অনুষঙ্গ। তবে আধুনিকতার ছোঁয়া আর সংরক্ষণের অভাবে শত বছরের পুরোনো এই পাবনার লোকসংস্কৃতি আজ অবলুপ্তির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে।
ভাঁজো উৎসব কী এবং কেন এই আয়োজন?
‘ভাঁজো’ শব্দের উৎপত্তি মূলত ভাজা বা অঙ্কুরোদগম থেকে। এটি সম্পূর্ণ নারীপ্রধান একটি উৎসব। সাধারণত ভাদ্র মাসের শেষের দিকে, গ্রামীণ কুমারী মেয়েরা ভালো বর (স্বামী) পাওয়ার আশায় এবং বিবাহিত নারীরা সংসারে সুখ-সমৃদ্ধি ও ভালো ফসলের কামনায় এই ব্রত পালন করেন।
শরতের আগমনী বার্তার সাথে সাথে এই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়। গ্রামীণ কিশোরী ও যুবতীরা দল বেঁধে নদী বা বিলের তলদেশ থেকে পরিষ্কার পলিমাটি সংগ্রহ করে। এরপর মাটির পাত্রে বা খিলানে সেই মাটি রেখে তাতে মাষকলাই, মুগ, সরিষা, ছোলা ও মটরসহ বিভিন্ন শস্যের বীজ বুনে দেওয়া হয়। প্রতিদিন ভোরে সুর্য ওঠার আগে সেই পাত্রে জল দেওয়া এবং ব্রতের গান গাওয়া হয়। জল দেওয়ার পর বীজ থেকে যখন কচি চারা বা অঙ্কুর বের হয়, তাকেই বলা হয় ‘ভাঁজো’।
তালি ও তবলার ছন্দে ‘ভাঁজো গান’
ভাঁজো উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো এর ঐতিহ্যবাহী গান। আশ্বিন মাসের প্রথম দিনে এই অঙ্কুরিত চারার পাত্রটি গ্রামের কোনো একটি নির্দিষ্ট বাড়ির উঠোনে বা খোলা তলায় আনা হয়। এরপর গ্রামের সব বয়সের নারীরা গোল হয়ে বসে করতালির ছন্দে ছন্দে গান ধরেন। কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই কেবল হাতের তালির মিষ্টি আওয়াজে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।
গানের কথায় উঠে আসে গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ, শাশুড়ি-ননদের খুনসুটি এবং ভালো ফসলের আকুতি। যেমন একটি জনপ্রিয় গানের লাইন:
“ভাঁজো লো কলকলানি, ভাঁজো লো মটরদানা… আজকে ভাঁজোর অধিবাস, কালকে ভাঁজোর বিয়ে…”
সারা রাত ধরে গান ও নাচের পর, পরদিন সকালে এই ভাঁজোর পাত্রটি স্থানীয় নদী বা বিলের জলে ধুমধামের সাথে বিসর্জন দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে শেষ হয় দিনব্যাপী এই উৎসবের আমেজ।
হারিয়ে যাচ্ছে পাবনার এই নিজস্ব ঐতিহ্য
একসময় চাটমোহরের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নারীদের ঘরে ঘরে এই উৎসবের চল থাকলেও, কালের বিবর্তনে তা এখন প্রায় স্তিমিত। আকাশ সংস্কৃতি ও স্মার্টফোনের যুগে গ্রামীণ তরুণ প্রজন্মের কাছে এই উৎসবের নাম অনেকটাই অজানা।
স্থানীয় প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা জানান, “ভাঁজো উৎসব শুধু একটি বিনোদন ছিল না, এটি ছিল পাবনার গ্রামীণ সম্প্রীতি ও কৃষি সংস্কৃতির মেলবন্ধন। নতুন প্রজন্মকে আমাদের এই শেকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে না দিলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি ইতিহাস থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।”
শেষ কথা
পাবনার ভাঁজো উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির গভীরতার কথা। সরকারি উদ্যোগে এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে প্রতি বছর চাটমোহরে যদি কেন্দ্রীয়ভাবে ‘ভাঁজো মেলা’ বা উৎসবের আয়োজন করা যায়, তবেই রক্ষা পাবে পাবনার এই বিলুপ্তপ্রায় লোকঐতিহ্য।