মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী বরাবরই সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখে অবস্থিত ইরানের তিনটি কৌশলগত দ্বীপ—আবু মুসা, গ্রেটার তুনব এবং লেসার তুনব—নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রায়ই নানামুখী জল্পনা-কল্পনা শোনা যায়। প্রশ্ন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের এই দ্বীপগুলো দখল করতে পারবে? আজকের আর্টিকেলে আমরা এর সামরিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত দিকগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করবো।
দ্বীপগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব
এই তিনটি দ্বীপ হরমুজ প্রণালীর একদম কাছে অবস্থিত, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রতিদিনকার তেলের এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয়। এই দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকা মানেই পুরো অঞ্চলের নৌ-চলাচল ও তেলের সরবরাহের ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রাখা। ইরানের জন্য এই দ্বীপগুলো তাদের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার প্রথম ধাপ।
সামরিক সক্ষমতা বনাম বাস্তবতা
বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। তবে কেবল সামরিক আক্রমণ চালানো আর একটি ভূখণ্ড দখল করে তা ধরে রাখা দুটি ভিন্ন বিষয়।
১. প্রতিরক্ষা বলয়: ইরান গত কয়েক দশকে এই দ্বীপগুলোতে শক্তিশালী রাডার সিস্টেম, অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। ফলে খুব সহজেই সেখানে বড় কোনো মার্কিন অভিযান চালানো বর্তমান প্রেক্ষাপটে কঠিন। ২. অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল (Asymmetric Warfare): ইরান প্রথাগত যুদ্ধের চেয়ে ড্রোন, স্পিডবোট এবং মাইন ব্যবহারের মতো অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী। সংকীর্ণ জলসীমায় মার্কিন বিশাল রণতরীগুলো ইরানের এই ক্ষুদ্র, দ্রুতগামী শক্তির সামনে বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি এই দ্বীপগুলো দখলের চেষ্টা করে, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরণের যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে:
- বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামাতে পারে।
- যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলো, যারা ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক অস্থিরতা এড়াতে চায়, তারা সরাসরি এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সমর্থন দেবে না।
আন্তর্জাতিক আইন ও ভূ-রাজনীতি
দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি কোনো এক পক্ষে দাঁড়িয়ে দ্বীপ দখল করে, তবে আন্তর্জাতিক আইনে এটি ‘আগ্রাসন’ হিসেবে গণ্য হবে। এটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
উপসংহার: দখল কি সম্ভব?
সামরিক ভাষায় উত্তর হলো—যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই দ্বীপগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সম্ভব। কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদে দখল করে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা মার্কিন সামরিক পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র জানে যে, কোনো ভূখণ্ড দখল করে রাখা এবং তা ধরে রাখা দুই বিষয়।
তাই বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরাসরি দখলের চেয়ে বরং কূটনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রক্সি প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ইরানকে চাপে রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।