Home শিক্ষা ও প্রযুক্তি প্রধান শিক্ষকের এক অনন্য লড়াইয়ের গল্প: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জাতীয়করণ হচ্ছে বান্দরবানের তিন্দু স্কুল!

প্রধান শিক্ষকের এক অনন্য লড়াইয়ের গল্প: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জাতীয়করণ হচ্ছে বান্দরবানের তিন্দু স্কুল!

0
প্রধান শিক্ষকের এক অনন্য লড়াইয়ের গল্প: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জাতীয়করণ হচ্ছে বান্দরবানের তিন্দু স্কুল!
সহকর্মীদের বেতন জোগাতে সাঙ্গু নদীতে নৌকা চালাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন; পাহাড়ের বুকে শিক্ষার আলো টিকিয়ে রাখার এক অনন্য কারিগর।

নিউজ ডেস্ক: পাবনা নিউজ ২৪

শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একজন মানুষ কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, তার এক অবিশ্বাস্য ও অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলের এক প্রধান শিক্ষক। নিজের সহকর্মী শিক্ষকদের বেতন জোগাতে যিনি নিজে পর্যটক ও যাত্রী বহনের নৌকা চালান। দুর্গম পাহাড়ের এই প্রধান শিক্ষকের এমন নিঃস্বার্থ সংগ্রামের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা সরাসরি নজরে আসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। আর এর পরেই আসে সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা—অবশেষে জাতীয়করণ হতে যাচ্ছে বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়।গতকাল রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে চলমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলাকালীন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী এই সুখবরটি দেশবাসীকে জানান।

সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর ঐতিহাসিক ঘোষণা

রোববার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, দুর্গম থানচির তিন্দু এলাকার এই স্কুলটিকে সরকারি করার বিষয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন।

সংসদে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “থানচির তিন্দু এলাকার স্কুলটিকে জাতীয়করণ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি বিশেষ নির্দেশ পাঠিয়েছেন। আজকে মহান সংসদে তিনি নিজে আমাকে স্লিপ পাঠিয়ে এই নির্দেশনা দিয়েছেন। আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে এই মহান সংসদকে জানাতে চাই, তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে জাতীয়করণ করা হবে।”সংসদ অধিবেশনে এই ঘোষণা আসার পরপরই উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মাঝে ব্যাপক করতালির সৃষ্টি হয় এবং পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়নে এই সিদ্ধান্তকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে প্রধানমন্ত্রীর নজর: পর্দার পেছনের গল্প

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান গণমাধ্যমকে এই নির্দেশনার পেছনের মূল ঘটনাটি বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি জানান, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনের জীবনসংগ্রাম এবং বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টার একটি প্রতিবেদন ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। বিষয়টি দেখার পরপরই প্রধানমন্ত্রী আবেগাপ্লুত হন এবং কালবিলম্ব না করে শিক্ষামন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।পাহাড়ি অঞ্চলের একটি জরাজীর্ণ স্কুলকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা সমকালীন ইতিহাসে বিরল। অতিরিক্ত প্রেস সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

নৌকা চালিয়ে বেতন জোগাড়: প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন তাঁর সহকর্মী শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় তহবিল না থাকায় নিজেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালানো শুরু করেন।

আয়ের সিংহভাগ স্কুলে দান: চলতি বছরের কেবল মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসে পর্যটকদের নৌকা বুঝিয়ে তিনি মোট ৪০ হাজার টাকা আয় করেন। এই আয়ের মধ্য থেকে নিজের সংসারের জন্য মাত্র ১০ হাজার টাকা রেখে বাকি ৩০ হাজার টাকাই তিনি তুলে দেন সহকর্মীদের বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য।

তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংকট ও বর্তমান চিত্র

পার্বত্য বান্দরবানের থানচি উপজেলার অত্যন্ত দুর্গম এবং পাহাড়ি নদী সাঙ্গুর অববাহিকায় অবস্থিত তিন্দু এলাকা। যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম প্রতিকূলতার কারণে এই অঞ্চলের শিশুরা যুগের পর যুগ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। স্থানীয় শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে ২০২০ সালে সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’।বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে মোট ৫৬ জন আদিবাসী ও পাহাড়ি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে এখানকার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন:

শিক্ষার্থীদের চরম দারিদ্র্য: বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারগুলোর পক্ষে সন্তানদের স্কুলের নিয়মিত বেতন বা সেশন ফি দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হয় না।

আর্থিক সংকট: শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো বেতন না পাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন খরচ ও শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতন দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

প্রধান শিক্ষকের ত্রাতা হওয়া: এই চরম সংকটময় মুহূর্তে স্কুলটি যেন বন্ধ হয়ে না যায়, সেজন্য প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন ছুটির দিনগুলোতে থানচি-তিন্দু-রেমাক্রী নৌপথে পর্যটক ও স্থানীয় যাত্রী পরিবহনের কঠিন কাজ বেছে নেন। সাঙ্গু নদীর উত্তাল তরঙ্গে নৌকা চালিয়ে উপার্জিত টাকা দিয়ে তিনি স্কুলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখেন।

পাহাড়ের শিক্ষায় এই জাতীয়করণের তাৎপর্য

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি স্কুলের ভাগ্যবদল নয়, বরং এটি পুরো পার্বত্য অঞ্চলের অবহেলিত ও প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক বিশাল মাইলফলক।

জাতীয়করণের ফলে স্কুলটির শিক্ষকরা এখন থেকে সরকারি স্কেলে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাবেন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বই, খাতা ও উপবৃত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। এর ফলে ঝরে পড়ার হার শূন্যে নেমে আসবে এবং দুর্গম পাহাড়ের কোণে কোণে শিক্ষার আলো আরও বেগবান হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর এই দ্রুত এবং মানবিক সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। অনেকেই বলছেন, প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনের মতো ত্যাগী শিক্ষকরাই হলেন সমাজের আসল নায়ক, যাদের সততা ও পরিশ্রমের মূল্যায়ন রাষ্ট্র স্বয়ং করেছে।

এক নজরে তিন্দু স্কুলের গল্প:

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: ২০২০ সাল (বর্তমান শিক্ষার্থী ৫৬ জন)।

লড়াইয়ের নায়ক: প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন (সহকর্মীদের বেতন দিতে নিজে নৌকা চালান)।

ঐতিহাসিক ঘোষণা: ২৮ জুন, সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ প্রকাশ।

ভবিষ্যৎ: খুব শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ সরকারি রূপ পাচ্ছে বিদ্যালয়টি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here