নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪:
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম পর্বের ম্যাচগুলো শেষ হতেই বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। মাঠের লড়াই, রণকৌশল, আর শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চ—সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্ব দেখলো এক অবিস্মরণীয় রাত। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেন ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কেটে নিয়েছে। অন্যদিকে, গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো এবং ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল বেলজিয়ামের বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা। প্রথম সেমিফাইনালে এবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও স্পেন, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে আরেকটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের জন্ম দিতে যাচ্ছে।
মরক্কোর রূপকথা থামিয়ে ফ্রান্সের দাপুটে ফুটবল
কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্স ও মরক্কো। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে রূপকথা তৈরি করা মরক্কোকে নিয়ে এবারও ফুটবল ভক্তদের মনে বাড়তি প্রত্যাশা ছিল। গ্রুপ পর্ব এবং শেষ ১৬-র বাধা পেরিয়ে মরক্কো যখন কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন ফরাসিদের তারা কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে। তবে মাঠের বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমের নিখুঁত রণকৌশলের সামনে আজ কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি আফ্রিকান সিংহরা।
ম্যাচের শুরু থেকেই ফরাসি আধিপত্য
ম্যাচের প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপ্পের গতি আর আন্তোয়ান গ্রিজম্যানের চতুর পাসিংয়ের মাধ্যমে মরক্কোর রক্ষণভাগকে শুরু থেকেই কোণঠাসা করে ফেলে ফরাসি ফরোয়ার্ডরা। মরক্কো ডিফেন্সিভ ব্লক তৈরি করে খেলার চেষ্টা করলেও ফ্রান্সের উইংভিত্তিক আক্রমণগুলো বারবার তাদের রক্ষণব্যুহ ভেঙে দিচ্ছিল।
আক্রমণ বনাম রক্ষণ: ফ্রান্সের ৩-০ গোলের জয়
পুরো ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করে ফ্রান্স ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে জয় লাভ করে। প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে এক দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাক থেকে প্রথম গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ফরাসি স্ট্রাইকার। মরক্কো গোল খেয়ে সমতায় ফেরার জন্য বেশ কিছু আক্রমণ চালালেও ফ্রান্সের রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষকের দেয়াল ভাঙতে পারেনি। প্রথমার্ধ ১-০ ব্যবধানে শেষ হওয়ার পর, দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্স আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে মরক্কোর ক্লান্ত ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে আরও দুটি চমৎকার গোল করে ফরাসিরা। এই দাপুটে জয়ের মাধ্যমে প্রথম দল হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ফ্রান্স, যা তাদের টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে দিলো।
ফুটবল রোমাঞ্চের চূড়ান্ত রূপ: বেলজিয়ামকে বিদায় করলো স্পেন
দিনের দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ছিল নাটকে ভরপুর, যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। যেখানে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই দল স্পেন ও বেলজিয়াম একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল। স্পেনের ঐতিহ্যবাহী টিকিটাকা বা পাসিং ফুটবল বনাম বেলজিয়ামের গতিময় কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত স্পেন ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয়ে সেমিফাইনালে পা রাখে।
প্রথমার্ধের যুদ্ধ: ফ্যাবিয়ান রুইজের ম্যাজিক ও বেলজিয়ামের প্রতিরোধ
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের মধ্যে বল দখলের তীব্র লড়াই শুরু হয়। স্পেন ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করছিল, আর বেলজিয়াম চেষ্টা করছিল দূরপাল্লার পাস দিয়ে স্প্যানিশ ডিফেন্সকে পরাস্ত করতে। ম্যাচের ৩০তম মিনিটে স্টেডিয়ামের গ্যালারি কাঁপিয়ে গোল করেন স্পেনের তারকা মিডফিল্ডার ফ্যাবিয়ান রুইজ। বক্সের বাইরে থেকে এক নিখুঁত ও জোরালো শটে তিনি বল জালে জড়ান, যা বেলজিয়ামের গোলরক্ষকের পক্ষে ঠেকানো অসম্ভব ছিল।১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে বেলজিয়াম তাদের আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দেয়। স্পেনের রক্ষণভাগের ছোট একটি ভুলের সুযোগ নিয়ে ম্যাচের ৪১তম মিনিটে বেলজিয়ামের তরুণ প্রতিভাবান ফরোয়ার্ড চার্লস ডি কেটেলিয়ারে একটি দুর্দান্ত ফিল্ড গোল করে ম্যাচে ১-১ সমতা ফেরান। গোলটি করার ক্ষেত্রে বেলজিয়ামের মাঝমাঠের নিখুঁত থ্রু পাসটি ছিল দেখার মতো। ফলে সমতা এবং টানটান উত্তেজনা নিয়ে বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয় হাফ এবং মিকেল মেরিনোর জয়সূচক মহাকাব্য
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের কৌশলগত লড়াই আরও তীব্র হয়। উভয় দলের কোচই বেঞ্চ থেকে নতুন খেলোয়াড় নামিয়ে ম্যাচের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। স্পেনের আক্রমণের পর পরই বেলজিয়াম পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছিল। দুই দলই গোল করার একাধিক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করলেও ফিনিশিংয়ের অভাবে গোল আসছিল না। ঘড়ির কাঁটা যতই ৯০ মিনিটের দিকে এগোচ্ছিল, মাঠে এবং গ্যালারিতে উত্তেজনা ততই বাড়ছিল। সবাই যখন ধরে নিয়েছিল ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ম্যাচের ৮৮তম মিনিটে স্পেনের পক্ষে ঐতিহাসিক গোলটি করেন মিকেল মেরিনো।ডান প্রান্ত থেকে আসা একটি ক্রস বেলজিয়ামের ডিফেন্ডাররা ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে বল পান মেরিনো। চলন্ত বলেই এক দুর্দান্ত ভলিতে তিনি বল প্রতিপক্ষের জালে পাঠিয়ে দেন। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ২-১। বাকি থাকা কয়েক মিনিটে এবং ইনজুরি টাইমে বেলজিয়াম অল-আউট আক্রমণে গেলেও স্পেনের জমাট ডিফেন্স আর ভাঙা সম্ভব হয়নি। রেফরির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই স্প্যানিশ শিবিরে শুরু হয় উল্লাস, আর বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের ফুটবলারদের চোখে দেখা যায় বিদায়ের অশ্রু।
সেমিফাইনালে মহাযুদ্ধ: মুখোমুখি ফ্রান্স ও স্পেন
প্রথম দুটি কোয়ার্টার ফাইনালের ফলাফল নির্ধারণ করে দিয়েছে টুর্নামেন্টের প্রথম সেমিফাইনালের লাইনআপ। ফাইনালে ওঠার মহালড়াইতে এবার মুখোমুখি হবে ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্স ও স্পেন। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে চলতি বিশ্বকাপের অলিখিত ফাইনাল।একদিকে ফ্রান্সের রয়েছে অদম্য গতি, শারীরিক ফুটবল এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো ম্যাচ উইনার। অন্যদিকে স্পেনের রয়েছে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাসিং এবং মিকেল মেরিনো ও ফ্যাবিয়ান রুইজের মতো ফর্মে থাকা তারকারা। দুই দলের এই রণকৌশলের লড়াই দেখতে এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব প্রহর গুনছে। আগামী সেমিফাইনালে কার মাথায় উঠবে বিশ্বজয়ের মুকুট পরার প্রথম ধাপ, তা দেখার জন্য ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষার প্রহর আরও দীর্ঘ হচ্ছে।