নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪ :
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান ভয়াবহ বন্যা ও অকাল বৃষ্টির কবলে পড়ে এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার শিক্ষার্থীদের অবস্থা অনেকটা ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো। শিক্ষা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ধাপে এসে প্রকৃতি ও পরিস্থিতির এমন প্রতিকূলতায় তারা চরম বিপর্যস্ত। পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছানো থেকে শুরু করে খাতা জমা দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে পরীক্ষার্থীদের যে শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, তা কেবল উদ্বেগের নয়, বরং গভীর ভাবনার বিষয়।
প্রতিকূলতায় পরীক্ষার্থীদের জীবনসংগ্রাম
আজ ১৪ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার। একদিকে ঝুম বৃষ্টি, অন্যদিকে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় হাঁটু বা কোমর সমান পানি পাড়ি দিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় বা কলার ভেলায় করে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। অনেকের বই-খাতা ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে, আবার অনেকের হাতে থাকা কাপড় বা জুতো পানিতে ভেসে গেছে। এমন মানসিক চাপের মধ্যে পরীক্ষা দেওয়া যে কতটা কঠিন, তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারও পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল চিত্র: কষ্টের দলিল
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক ও টিকটকে) ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়, এক শিক্ষার্থী ব্যাগ মাথায় নিয়ে কোমর সমান পানির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু শিক্ষার্থী পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে ফেরার পথে নৌকায় করে ফিরছে কারণ রাস্তাঘাট বিলীন হয়ে গেছে। এই ছবিগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সহমর্মিতার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ প্রশ্ন তুলছে, এই সংকটময় মুহূর্তে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত কি পুনর্বিবেচনা করা যেত না? মানবিক বিপর্যয়কে উপেক্ষা করে পরীক্ষার রুটিন অটল রাখার যৌক্তিকতা কতটুকু?
শিক্ষামন্ত্রীর ভূমিকা ও করণীয়: একটি বিশ্লেষণ
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। সংকটকালে মন্ত্রীর তরফ থেকে যে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ আশা করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি ছিল:
১. জরুরি অবস্থা ঘোষণা: দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় পরীক্ষা স্থগিত করা বা বিকল্প তারিখ নির্ধারণ করা সময়ের দাবি ছিল। যখন জীবন রক্ষার প্রশ্নটি বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন পরীক্ষা তার গুরুত্ব হারায়।
২. পরিবহন সুবিধা: শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নৌকা বা ট্রলারের ব্যবস্থা করতে পারত, যাতে শিক্ষার্থীরা অন্তত নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে।
৩. নমনীয়তা: দুর্যোগের কারণে যেসব শিক্ষার্থী সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা বা পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ থাকা উচিত ছিল।
৪. সহমর্মিতামূলক বিবৃতি: শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান বা আশ্বাস অনেক আগেই আসা উচিত ছিল। কেবল রুটিন মাফিক পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া মানেই শিক্ষার মান বজায় রাখা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি মানবিক বিপর্যয় কি এড়ানো যেত না?
একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। যখন একজন পরীক্ষার্থী জানেই না সে আজ বাড়ি ফিরতে পারবে কি না, তখন সে পরীক্ষায় কী মনোযোগ দেবে? এই পরিস্থিতি অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দেখেছি, অতীতেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পরীক্ষা পেছানোর নজির রয়েছে। এবার কেন সেই একই সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি করা হলো, তা শিক্ষা নীতিনির্ধারকদের কাছেই বড় প্রশ্ন।
পাবনা নিউজ ২৪-এর পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আগামী দিনগুলোতে পরীক্ষার সময়সূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের সাথে আরও নিবিড় সমন্বয় করতে হবে। কোনো পরীক্ষার চেয়ে একটি তরুণের জীবন ও স্বপ্ন অনেক বেশি মূল্যবান। এখনো সময় আছে, বাকি পরীক্ষাগুলোর ক্ষেত্রে অন্তত বন্যাদুর্গত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রকৃতির সাথে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যখন একজন শিক্ষার্থীকে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়, তখন তা আমাদের ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং তাদের আগামী দিনের পথচলা মসৃণ করবে।