আমাদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা আছে যে, যেকোনো খাবারই তাজা বা টাটকা অবস্থায় সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু হয়। কিন্তু রান্নার বিজ্ঞানের নিয়মে কিছু খাবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। কিছু নির্দিষ্ট খাবার রান্না করার সাথে সাথে খাওয়ার চেয়ে কয়েক ঘণ্টা পর কিংবা পরদিন বাসি করে খেলে তার স্বাদ ও সুগন্ধ অনেক বেশি খোলতাই হয়।
পাবনা নিউজ ২৪-এর আজকের লাইফস্টাইল ফিচারে আমরা জানবো এমন কিছু পরিচিত খাবার সম্পর্কে, যেগুলো বাসি হলে তার স্বাদ দ্বিগুণ হয়ে যায়।
বাসি হলে খাবারের স্বাদ বাড়ার বৈজ্ঞানিক কারণ
কোনো খাবার বাসি হলে কেন সুস্বাদু লাগে, তার পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। রান্নার পর খাবার যখন আস্তে আস্তে ঠান্ডা হতে থাকে, তখন এর ভেতরের প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং মশলার উপাদানগুলো নিজেদের মধ্যে নতুন রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করে। বিশেষ করে পেঁয়াজ, রসুন, আদা এবং বিভিন্ন গুঁড়ো মশলা তরকারির মূল উপাদানের (যেমন: মাংস বা সবজি) ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়। ফলে পরদিন তরকারির ঝোল ঘন হয় এবং স্বাদ অনেক বেশি চমৎকার লাগে।
যেসব খাবারের স্বাদ বাসি হলে বাড়ে
আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকা বেশ কিছু জনপ্রিয় খাবার বাসি অবস্থায় দারুণ লাগে:
১. গরুর মাংসের ভুনা বা কষা মাংস
যেকোনো মাংসের তরকারি, বিশেষ করে গরুর মাংসের ভুনা বা কষা মাংস রান্নার পরপরই খাওয়ার চেয়ে পরদিন গরম করে খেলে অনেক বেশি সুস্বাদু লাগে। বাসি হওয়ার পর মাংসের ফাইবার বা আঁশের ভেতরে মশলা ও চর্বি খুব ভালোভাবে ঢুকে যায়। এছাড়া ঝোলটি ঘন হয়ে এক ধরণের আঠালো ভাব আসে, যা ভাতের সাথে জমে ক্ষীর।
২. সব ধরণের ডাল ও চচ্চড়ি
বাঙালি ঘরের ডাল, বিশেষ করে পাঁচমিশালি ডাল, মাষকলাইয়ের ডাল বা লাউ-ডাল রান্নার কয়েক ঘণ্টা পর বা পরদিন সকালে বেশি স্বাদ লাগে। একইভাবে বিভিন্ন সবজি দিয়ে তৈরি চচ্চড়ি বা ল্যাবড়া বাসি হলে সবজির নিজস্ব মিষ্টি রস এবং মশলার ফ্লেভার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
৩. বিরিয়ানি ও খিচুড়ি
অনেকেরই প্রিয় খাবার বিরিয়ানি কিংবা ভুনা খিচুড়ি। খেয়াল করে দেখবেন, রাতে বেঁচে যাওয়া বিরিয়ানি বা খিচুড়ি পরদিন সকালে হালকা ঘি বা তেল দিয়ে গরম করলে তার থেকে চমৎকার সুগন্ধ বের হয়। চালের ভেতরে মশলা ও মাংসের নির্যাস পুরোপুরি শোষিত হওয়ার কারণে বাসি বিরিয়ানি বা খিচুড়ির স্বাদ অনেক বেড়ে যায়।
৪. মাছের ঝোল বা টক (অম্বল)
ছোট বা বড় মাছের পাতলা ঝোল কিংবা চালতা, আম বা তেঁতুল দিয়ে তৈরি মাছের টক বাসি হলে খেতে অসাধারণ লাগে। বিশেষ করে ইলিশ কিংবা রুই মাছের বাসি ঝোল অনেকেরই অত্যন্ত প্রিয়। ঠান্ডা হওয়ার পর মাছের ভেতরের স্বাদ ঝোলে এবং ঝোলের টক-ঝাল ফ্লেভার মাছের টুকরোতে পারফেক্টলি ঢুকে যায়।
৫. স্যুপ ও স্টু
হালকা খাবারের মধ্যে যেকোনো থিক স্যুপ বা ভেজিটেবল স্টু বাসি হলে বেশি চমৎকার লাগে। সময় পাওয়ার কারণে সবজি ও মাংসের নির্যাস স্যুপের পানির সাথে পুরোপুরি মিশে গিয়ে এর স্বাদকে আরও রিচ (Rich) করে তোলে।
বাসি খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা
বাসি খাবার খাওয়া যেমন আনন্দের, তেমনই স্বাস্থ্যের সুরক্ষার কথা মাথায় রাখা জরুরি:
খাবার ঠান্ডা হওয়ার পর অবশ্যই দ্রুত ফ্রিজে (Refrigerate) সংরক্ষণ করতে হবে। বাইরে দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখলে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে।
ফ্রিজ থেকে বের করে খাবারটি খাওয়ার আগে খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে বা গরম করে নিতে হবে।
উপসংহার
খাবারের এই স্বাদ বদল মূলত রান্নার এক জাদুকরী প্রক্রিয়া। তাই রান্নার পর কোনো খাবার বেঁচে গেলে তা ফেলে না দিয়ে বা অবহেলা না করে সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ করুন। পরদিন গরম করে প্লেটে নিয়ে দেখুন, হয়তো এটিই আপনার সেই দিনের সেরা খাবার হয়ে উঠবে!