নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪
০১ জুলাই, ২০২৬ |
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি বিতর্ক মানবসমাজে চলে আসছে—বিজ্ঞান ও ধর্ম কি একে অপরের পরিপন্থী, নাকি পরিপূরক? আধুনিক বস্তুবাদী যুগের একদল মানুষ মনে করেন বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে ধর্মের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে, মহাজাগতিক ও মানবদেহের রহস্য যত উন্মোচিত হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা তত বেশি অবাক হয়ে দেখছেন যে—আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশত বছর আগে পবিত্র আল-কোরআনে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসনে যে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আজ ঠিক সেই সত্যগুলোকেই আবিষ্কার করছে।ধর্মীয় বাণীর সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের এই চমৎকার ও অলৌকিক মিলগুলো বর্তমান যুগের তরুণ পাঠকদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। আজ পাবনা নিউজ ২৪-এর এই বিশেষ তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব পবিত্র কোরআনের অলৌকিক কিছু বৈজ্ঞানিক মিল এবং রোজা বা ধ্যানের মতো ধর্মীয় অনুশাসনগুলো আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী।
পবিত্র কোরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান: অলৌকিক কিছু মিল
পবিত্র কোরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়, এটি মূলত একটি ‘গাইডবুক’ বা জীবনবিধান। তবে এতে এমন কিছু সৃষ্টিতত্ত্বের ইঙ্গিত রয়েছে, যা অবতীর্ণ হওয়ার সময়ে কোনো মানুষের পক্ষে জানা প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব ছিল।
১. মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ (Expansion of the Universe)
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে (১৯২৯ সালে) জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করেন যে, এই মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং এটি প্রতিনিয়ত চারদিকে প্রসারিত বা বড় হচ্ছে। বিজ্ঞানের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের প্রায় ১৪০০ বছর আগে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
“আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমিই একে সম্প্রসারিত করছি।” (সূরা আজ-জারিয়াত, আয়াত: ৪৭)
২. বিগ ব্যাং বা সৃষ্টির আদি অবস্থা (The Big Bang Theory)
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতে, এই মহাবিশ্ব এক সময় একটি বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল। পরে একটি মহা-বিস্ফোরণ বা ‘বিগ ব্যাং’-এর মাধ্যমে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী আলাদা হয়ে যায়। এই মহাজাগতিক সত্যটি কোরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে:
“যারা কুফরি করে তারা কি দেখে না যে, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম…” (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩০)
৩. মাতৃগর্ভে ভ্রূণের ক্রমবিকাশ (Embryology)
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আল্ট্রাসাউন্ড বা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে মাতৃগর্ভে মানব শিশুর বড় হওয়ার যে স্তরগুলো (জাইগোট থেকে ভ্রূণ এবং হাড় ও মাংসের গঠন) আবিষ্কার করেছে, তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় সূরা আল-মুমিনুনের ১২ থেকে ১৪ নম্বর আয়াতের সাথে। যেখানে ‘আলাকাহ’ (জোকের মতো ঝুলে থাকা বস্তু) এবং ‘মুদগাহ’ (চিবানো মাংসের মতো পিণ্ড) শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক ও গবেষকদেরও তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
ধর্মীয় অনুশাসন স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী?
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলো আপাতদৃষ্টিতে কেবল আধ্যাত্মিক মনে হলেও, আধুনিক চিকিৎসা ও মনস্তত্ত্ববিজ্ঞান বলছে এগুলো মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ এবং মানসিক সুস্থতার জন্য এক একটি মহৌষধ।
১. রোজা বা উপবাস এবং ‘অটোফেজি’ (Autophagy)
ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো রমজান মাসের রোজা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার জোর সুপারিশ করছে।
বিজ্ঞান কী বলে: ২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওশুমি আবিষ্কার করেন ‘অটোফেজি’ (Autophagy) নামক একটি শারীরিক প্রক্রিয়া, যার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। অটোফেজি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে শরীর দীর্ঘ সময় (১২-১৬ ঘণ্টা) না খেয়ে থাকলে ভেতরের সুস্থ কোষগুলো ক্ষতিকর, মৃত ও ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলোকে খেয়ে ফেলে শরীরকে পরিষ্কার করে। অর্থাৎ, প্রতি বছর এক মাস রোজা রাখার মাধ্যমে আমাদের শরীর প্রাকৃতিকভাবেই ক্যানসার ও লিভারের জটিল রোগ থেকে মুক্তি পায়।
নামাজ ও শারীরিক সুস্থতা
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরের প্রতিটি জয়েন্ট বা সন্ধিস্থলের ব্যায়াম হয়।
বিজ্ঞান কী বলে: রুকু এবং সেজদা করার সময় মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন (Blood Circulation) সবচেয়ে নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে সেজদার সময় মাথায় পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছায়, যা আমাদের স্মৃতিশক্তি বাড়াতে, উচ্চ রক্তচাপ কমাতে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা সচল রাখতে সাহায্য করে। নামাজের এই শারীরিক মোশন বা ভঙ্গিগুলো পিঠ ও কোমরের ব্যথা কমাতেও ভূমিকা রাখে।
ধ্যান বা মোরাকাবা এবং মানসিক প্রশান্তি
বিভিন্ন ধর্মে মনকে শান্ত করার জন্য ধ্যান, জিকির বা মোরাকাবার নির্দেশ রয়েছে।
বিজ্ঞান কী বলে: বর্তমানের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক জীবনে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস একটি বড় ব্যাধি। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, নিয়মিত ধ্যান বা মনোযোগ সহকারে প্রার্থনা করলে মস্তিষ্কে ‘কর্টিসল’ (Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ কমে যায় এবং ‘সেরোটোনিন’ ও ‘এন্ডোরফিন’ হরমোন বাড়ে, যা মানুষকে দুশ্চিন্তা ও ডিপ্রেশন থেকে মুক্ত রাখে এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে।পবিত্র কোরআনের বাণী এবং ধর্মীয় জীবনযাপন ও অনুশাসনগুলো যে কতটা বাস্তবসম্মত এবং বৈজ্ঞানিক, আধুনিক বিজ্ঞান দিন দিন তারই অকাট্য প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞান আমাদের শেখায় ‘কীভাবে’ একটি প্রক্রিয়া ঘটে, আর ধর্ম আমাদের শেখায় ‘কেন’ এবং ‘কী উদ্দেশ্যে’ আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি। তাই বিজ্ঞান ও ধর্ম একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং সত্যকে জানার দুটি ভিন্ন এবং পরিপূরক মাধ্যম। পাবনা নিউজ ২৪-এর পক্ষ থেকে তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান—ধর্মকে শুধু অন্ধভাবে নয়, এর ভেতরের বিজ্ঞান ও কল্যাণকর শিক্ষাকে জেনে নিজের জীবনে প্রয়োগ করুন।