নদীমাতৃক ও ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ আজ এক চরম পরিবেশগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের তালিকায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এক সময় যে ঋতুচক্রের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ছিল, তা আজ অনেকটাই এলোমেলো। অসময়ে বন্যা, তীব্র দাবদাহ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মারাত্মক বায়ুদূষণে দেশের পরিবেশ আজ এক আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান উপাদান—বায়ু, পানি ও মাটি—প্রতিদিনই বিষাক্ত হচ্ছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের পরিবেশের এই ভয়াবহ রূপ এবং এর থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
১. রেকর্ড ভাঙা দাবদাহ ও তাপপ্রবাহ (Heatwave)
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের পরিবেশের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি দৃশ্যমান হয়েছে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমে।
চরম আবহাওয়া: গ্রীষ্মকালে দেশের তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত আগের রেকর্ডগুলো ভেঙে দিচ্ছে। তীব্র দাবদাহে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ছে, বাড়ছে হিট স্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি।
ঋতু পরিবর্তন: বর্ষাকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া এবং শীতের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, দেশের সামগ্রিক আবহাওয়ার আচরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
২. মেগাসিটি ঢাকার বায়ুদূষণ: বিশ্বের শীর্ষে আমাদের রাজধানী
বাংলাদেশের পরিবেশগত সংকটের অন্যতম বড় উদাহরণ রাজধানী ঢাকার বায়ুর মান। প্রায়শই বৈশ্বিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (AQI) ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় এক নম্বরে চলে আসে।
দূষণের কারণ: অপরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি, কালো ধোঁয়া ছড়ানো ফিটনেসবিহীন যানবাহন, শহরের চারপাশে গড়ে ওঠা ইটের ভাটা এবং নির্মাণাধীন প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা এই বায়ুদূষণের প্রধান উৎস।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: এই বিষাক্ত বাতাস ক্রমাগত নেওয়ার ফলে দেশের মানুষের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার, অ্যাজমা এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
৩. নদী দূষণ ও প্লাস্টিক বর্জ্যের মহাসংকট
‘নদীমাতৃক’ বাংলাদেশের প্রাণ যে নদীগুলো, সেগুলো আজ বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা থেকে শুরু করে দেশের জেলা-উপজেলার অভ্যন্তরীণ নদীগুলো আজ শিল্পবর্জ্য ও কেমিক্যালের কারণে মৃতপ্রায়।
এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (Single-use Plastic) এবং পলিথিনের লাগামহীন ব্যবহার। এগুলো ড্রেন, খাল-বিল ও নদীতে গিয়ে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে, যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরগুলোতে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
৪. বনাঞ্চল উজাড় ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস
নগরায়ণ এবং আবাসন শিল্পের প্রসারের কারণে দেশের বনভূমি ও সবুজ প্রকৃতি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে মানুষের বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং গাছ কাটার ফলে বন্যপ্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান হারাচ্ছে। একটি দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য মোট ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন হলেও, বাংলাদেশে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
এই পরিবেশ সংকট থেকে বাঁচার উপায় কী?
বাংলাদেশকে এই পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে:
ব্যাপক বৃক্ষরোপণ: গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব কমাতে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে ছাদবাগান, সামাজিক বনায়ন এবং খালি জায়গায় গাছ লাগানোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
প্লাস্টিক বর্জন ও আইন প্রয়োগ: ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং পাটের তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ: কলকারখানার তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করে বাধ্যতামূলকভাবে ‘ইটিপি’ (ETP) প্ল্যান্ট চালু রাখতে হবে।
নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার: কয়লা বা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ও পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
শেষ কথা
পরিবেশের ক্ষতি করার অর্থ হলো নিজেদের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলা। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের একার পক্ষে সব করা সম্ভব নয় ঠিকই, তবে দেশের ভেতরের পরিবেশ রক্ষা করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ আমাদের। প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে আমাদের নদী, বাতাস আর সবুজ প্রকৃতিকে আবার সুস্থ করে তুলতে।