বন্যা বা জলবদ্ধতা কোনো বাধাই নয়; চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়ার প্রত্যন্ত জনপদে ল্যাপটপ, লাইব্রেরি ও সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে শিশুদের দুয়ারে হাজির হচ্ছে ‘নৌকা স্কুল’।
পাবনা বিশেষ প্রতিনিধি, পাবনা নিউজ ২৪: বর্ষা এলেই যখন দেশের অনেক অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়, থমকে দাঁড়ায় হাজারো শিশুর পড়াশোনা; ঠিক তখনই পাবনার চলনবিল অঞ্চলের চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে বন্যা বা জলাবদ্ধতা শিশুদের স্কুল থেকে দূরে রাখতে পারে না, কারণ স্কুল নিজেই এসে হাজির হয় শিশুর বাড়ির ঘাটে! পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়াসহ বিলঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে ‘সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা’র হাত ধরে গড়ে ওঠা এই ‘ভাসমান বিদ্যালয়’ বা ফ্লোটিং স্কুল আজ শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে জলবায়ু অভিযোজনের এক অনন্য মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
যেভাবে চলে এই নৌকার পাঠশালা
এই বিশেষ স্কুলগুলো মূলত এক একটি বড় নৌকা। প্রতিদিন সকালে নৌকাগুলো বিলের ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে। এরপর প্রতিটি গ্রামের বাড়ির সামনে গিয়ে নোঙর ফেলে এবং স্থানীয় শিশুদের নৌকায় তুলে নেয়। নৌকার ভেতরেই রয়েছে আধুনিক ক্লাসরুম। কাঠের বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ড তো আছেই, সাথে রয়েছে ইন্টারনেট সংযোগসহ ল্যাপটপ এবং ছোট একটি লাইব্রেরি। ছাদের ওপর বসানো সোলার প্যানেল বা সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চলে ভেতরের লাইট, ফ্যান এবং কম্পিউটার। এক একটি ব্যাচের ক্লাস শেষ হলে নৌকাটি আবার শিশুদের তাদের বাড়ির ঘাটে নিরাপদে নামিয়ে দিয়ে আসে।

প্রযুক্তির ছোঁয়া প্রত্যন্ত বিলঞ্চলে
এই ভাসমান স্কুলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর আধুনিকতা। শহরের একটি শিশু যে প্রযুক্তির সুবিধা পায়, চলনবিলের ভেতরের এই শিশুরা নৌকায় বসেই সেই সুযোগ পাচ্ছে। তারা কম্পিউটারে আঁকাআঁকি শিখছে, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর তৈরি বিভিন্ন শিক্ষামূলক তথ্যচিত্র দেখছে। শুধু প্রাথমিক শিক্ষাই নয়, এই নৌকোগুলো রাতের বেলা পরিণত হয় কৃষকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। বিলের চাষিরা এখানে এসে আধুনিক চাষাবাদ, বন্যা-সহনশীল ফসল উৎপাদন এবং পরিবেশ রক্ষা সম্পর্কে জানতে পারেন।
ইউনেস্কো থেকে জাতিসংঘের স্বীকৃতি
পাবনার এই উদ্ভাবনী আইডিয়া আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত। এই প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান এবং তাঁর সংস্থা ‘সিধুলাই’ এই কাজের জন্য জাতিসংঘের পরিবেশ পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক বহু সম্মাননা লাভ করেছে। এমনকি পাবনার এই ‘ভাসমান স্কুল’ মডেল অনুসরণ করে এখন কম্বোডিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতেও বন্যার্ত শিশুদের জন্য নৌকা স্কুল তৈরি করা হচ্ছে। এটি পুরো পাবনাবাসীর জন্য এক বিশাল গৌরবের বিষয়।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলোর রূপ প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভাসমান স্কুলের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন আরও বাড়ছে। তবে এই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। যদি সঠিক সহযোগিতা পাওয়া যায়, তবে পাবনার এই মডেল দেশের প্রতিটি বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।