স্পোর্টস ডেস্ক | পাবনা নিউজ ২৪
ফুটবল বিশ্বকাপে বাংলাদেশ জাতীয় দল কবে খেলবে, সেই উত্তর হয়তো আপাতত আমাদের জানা নেই। কিন্তু ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আসরে ফুটবলাররা মাঠে না নামলেও, বিশ্বমঞ্চের মূল আলোয় ঠিকই পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। আর এই গৌরবমন্ডিত ইতিহাসটি তৈরি করে দেখিয়েছেন সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে জন্ম নেওয়া প্রবাসী বাংলাদেশি মিউজিক প্রডিউসার এবং ডিজে সানজয় দেব (Sanjoy)। প্রথম কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিল্পী হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল মিউজিক অ্যালবাম এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চ মাতানোর অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। এটি শুধু সিলেটবাসীর নয়, বরং পুরো বাংলাদেশ ও বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি বাঙালির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ট্র্যাকে সানজয়ের ‘সিইর সিইর’
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অফিশিয়াল মিউজিক অ্যালবামে জায়গা করে নিয়েছে সানজয়ের দুর্দান্ত কম্পোজিশনে তৈরি করা গান “Siir Siir” (সিইর সিইর)। এই বিশেষ গানটিতে সানজয়ের ম্যাজিকাল মিউজিকের সাথে কণ্ঠ দিয়েছেন এবং স্ক্রিন শেয়ার করেছেন বলিউডের তুমুল জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ও কানাডিয়ান গ্লোবাল তারকা নোরা ফাতেহি এবং ফরাসি হিপ-হপ সেনসেশন ভেজেড্রিয়াম (Vegedream)। সাউথ এশিয়ান ক্ল্যাসিকাল টিউন, অ্যারাবিক বিটস এবং ফ্রেঞ্চ-আফ্রিকান ঘরানার এক অসাধারণ ফিউশনে তৈরি এই গানটি ইতিমধ্যেই ফিফার অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্মগুলোতে কোটি কোটি ভিউ ও শ্রোতাদের তুমুল প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
টরন্টোর উদ্বোধনী মঞ্চে লাল-সবুজের জ্যাকেট ও দেশপ্রেম
কানাডার টরন্টোর বিখ্যাত বিএমও (BMO) স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লাখো দর্শকের সামনে লাইভ পারফর্ম করেন সানজয়। তবে তিনি শুধু গান বা রিদম দিয়েই বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করেননি, বরং নিজের পোশাকের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবের মঞ্চে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সানজয়ের পরনে ছিল একটি বিশেষ নকশার মেরুন রঙের জ্যাকেট। এই জ্যাকেটের ডান হাতার ওপর সুনিপুণ সুতোর বুননে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের তিনটি চিরচেনা প্রতীক: রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় ফুল শাপলা এবং লাল-সবুজ পতাকার বৃত্ত। পারফর্ম করার সময় সানজয় যখনই হাত উঁচিয়ে ডিজে ডেক্স সামলাচ্ছিলেন, তখনই বিশ্ববাসীর চোখে পড়ছিল বাংলাদেশের এই গর্বের স্মারকগুলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার এই পোশাকের ছবি ও ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়।
শ্রীমঙ্গল থেকে বিশ্বমঞ্চের রূপকথা
সানজয়ের জন্ম সিলেটের চা-বেষ্টিত সুন্দর অঞ্চল শ্রীমঙ্গলে। শৈশবের কিছু সময় চট্টগ্রামে কাটানোর পর খুব ছোটবেলাতেই পরিবারের সাথে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে বড় হন। পরিবারে মা ও নানীর সঙ্গীতচর্চার গভীর অনুপ্রেরণায় শৈশব থেকেই গানের প্রতি তার নিখাদ ভালোবাসা তৈরি হয়। ইলেকট্রনিক ড্যান্স মিউজিকের (EDM) সাথে ঐতিহ্যবাহী বাংলা সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি নিজের একটি শক্তিশালী ও আলাদা বৈশ্বিক পরিচিতি তৈরি করেছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশের বিপিএল (BPL)-এর অফিশিয়াল থিম সং তৈরি করে দেশের মানুষের মন জয় করেছিলেন। এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের হাবিব ওয়াহিদ এবং শ্রেয়া ঘোষালের মতো শীর্ষস্থানীয় তারকাদের সাথেও কাজ করার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে সানজয়ের আবেগঘন অনুভূতি
বিশ্বকাপের মঞ্চ কাঁপানোর পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সানজয় দেব বলেন,
“যখন আমি বিশ্বকাপের ওই বিশাল মঞ্চে দাঁড়িয়ে পারফর্ম করছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল পুরো বাংলাদেশ আমার সাথে আছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, সমর্থন ও দোয়া ছাড়া আজ বিশ্বমঞ্চের এই অবস্থানে আসা আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।”
বিশ্বকাপের সবুজ মাঠে আমাদের ফুটবল দল না থাকলেও, কোটি কোটি বিশ্বদর্শকের সামনে সানজয় যেভাবে বাংলাদেশের নাম, সংস্কৃতি আর লাল-সবুজের অহংকারকে সগৌরবে তুলে ধরেছেন, তা প্রতিটি বাঙালির বুক গর্বে ভরিয়ে দেয়। পাবনা নিউজ ২৪ স্পোর্টস ডেস্কের পক্ষ থেকে এই কৃতি সন্তানের জন্য রইল অফুরন্ত শুভেচ্ছা। সিলেটের এই তরুণ মিউজিশিয়ান প্রমাণ করে দিলেন—স্বপ্ন যদি আকাশছোঁয়া হয় এবং তা পূরণ করার মতো কঠোর জেদ ও সততা থাকে, তবে বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে বড় আলোটাও নিজের করে নেওয়া সম্ভব।