নিউজ ডেস্ক: পাবনা নিউজ ২৪
৩০ জুন, ২০২৬
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক সোনালী অধ্যায়। কোনো রকম বাছাইপর্বের (Qualifiers) জটিল সমীকরণ বা খাদের কিনারার লড়াই ছাড়াই টাইগ্রেসরা সরাসরি জায়গা করে নিয়েছে ২০২৮ সালের আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। ২০২৬ সালের চলমান বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে সেরা আট দলের (Top Eight) মধ্যে থেকে এই কীর্তি গড়েছে নিগার সুলতানা জ্যোতির দল। লাল-সবুজের মেয়েদের এমন বিশ্বজয়ী হুঙ্কারে দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে এখন বইছে উৎসবের আমেজ।
সরাসরি বিশ্বমঞ্চে খেলার নেপথ্য গল্প
আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, চলমান ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দুই গ্রুপের শীর্ষ ৪টি করে মোট ৮টি দল আগামী ২০২৮ সালের আসরে সরাসরি খেলার টিকিট পাবে। বাংলাদেশ গ্রুপ ১-এ খেলেছে, যা টুর্নামেন্টের অন্যতম কঠিন গ্রুপ বা ‘গ্রুপ অব ডেথ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। এই গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী ছিল অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী ক্রিকেট পরাশক্তিরা।তবে প্রতিকূলতাকে জয় করাই যেন টাইগ্রেসদের প্রধান শক্তির জায়গা। গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী পাকিস্তান ও নেদারল্যান্ডসকে উড়িয়ে দিয়ে দুর্দান্ত দুটি জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের এক আসরে জোড়া জয় পাওয়ার নজির বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট ইতিহাসে এবারই প্রথম। এই ইতিহাস গড়া পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই তারা পয়েন্ট টেবিলে গ্রুপের শীর্ষ চারে নিজেদের অবস্থান মজবুত করে এবং ২০২৮ সালের আসরের টিকিট সরাসরি পকেটে পোরে।
কাপ্তান জ্যোতি ও স্বপ্নসারথিদের বীরত্বগাথা
বাংলাদেশ দলের এই মহাকাব্যিক যাত্রার মূল কান্ডারি ছিলেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। কেবল লিডারশিপ বা দল পরিচালনা নয়, ব্যাট হাতেও তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে জ্যোতির ২০ বলে ৩২ রানের মারকুটে ইনিংস এবং দলের কঠিন সময়ে উইকেটে টিকে থাকার মানসিকতা তরুণ ক্রিকেটারদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তার দূরদর্শী অধিনায়কত্বই মাঠের প্রতিটি মুহূর্তে বাংলাদেশকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছে।
জ্যোতির পাশাপাশি মাঠ কাঁপিয়েছেন একঝাঁক প্রতিভাবান টিম মেম্বার:
স্বর্ণা আক্তার (অলরাউন্ডার): পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ব্যাট-বলে অসাধারণ অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করে ম্যাচসেরা (Player of the Match) হন এই তরুণী। দলের মিডল অর্ডারের মূল ভরসা হয়ে উঠেছেন তিনি।
সোবহানা মোস্তারী (ব্যাটার): টপ অর্ডারে সোবহানার ধারাবাহিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বমানের বোলিংয়ের সামনে তার ৪৮ বলে ৪২ রানের ইনিংসটি ছিল অসাধারণ ধৈর্যের প্রতীক।
নাহিদা আক্তার ও মারুফা আক্তার (বোলিং ইউনিট): বাংলাদেশের বোলিং ডিপার্টমেন্টকে নেতৃত্ব দিয়েছেন নাহিদা। প্রতিপক্ষের রান তোলার গতি টেনে ধরার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু এনে দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে মারুফা আক্তারের গতি আর সুইং প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের থিতু হতে দেয়নি।
জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে অনবদ্য ব্যাটিং প্রদর্শন করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন জুয়াইরিয়া, যা বাংলাদেশের সরাসরি কোয়ালিফাই করার পথকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল।
বাছাইপর্বের দীর্ঘশ্বাস থেকে মুক্তি
এর আগে প্রতিটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে হলে বাংলাদেশকে তীব্র মানসিক চাপের বৈশ্বিক বাছাইপর্বের বৈতরণী পার হতে হতো। বাছাইপর্বের সামান্য একটি ভুল পুরো ২ বছরের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারত। কিন্তু এবার সরাসরি মূল পর্ব নিশ্চিত হওয়ায় দল আগামী দুই বছর সম্পূর্ণ চাপমুক্ত থেকে নিজেদের আরও উন্নত করার সুযোগ পাবে। ২০২৮ সালের এই আসরটি অনুষ্ঠিত হবে ক্রিকেটের মক্কা খ্যাত ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের মাটিতে, যার জন্য এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সাজাতে পারবে বিসিবি (BCB)।নিগার সুলতানা জ্যোতি এই ঐতিহাসিক অর্জন শেষে তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “সরাসরি ২০২৮ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা আমাদের জন্য অনেক বড় একটা প্রাপ্তি। আমরা প্রমাণ করেছি যে আমরা বিশ্বমঞ্চে বড় দলগুলোর সাথে লড়াই করার ক্ষমতা রাখি। এই আত্মবিশ্বাস আমাদের ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নেবে।