নিউজ ডেস্ক : পাবনা নিউজ ২৪
বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে ক্যানসার অন্যতম রূপ ধারণ করেছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি এবং প্রযুক্তির ছোঁয়া সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC)-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যানসার বর্তমানে হৃদ্রোগের পর বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে, যা গোটা মানবজাতির জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা।
বৈশ্বিক ক্যানসার পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর পৃথিবীজুড়ে লাখ লাখ মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, এবং কর্মব্যস্ত জীবনধারার কারণে এই মরণব্যাধির প্রকোপ কমার বদলে বেড়েই চলেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও ক্যানসার একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো রোগ নির্ণয় (Early Detection) না হওয়া এবং সচেতনতার অভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
প্রায় ১০টির মধ্যে ৪টি ক্যানসার প্রতিরোধযোগ্য
প্রতিবেদনের সবচেয়ে আশার দিকটি হলো—বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্যানসার মানেই নিশ্চিত মৃত্যু নয়। সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতি ১০টি ক্যানসার মামলার ৪টিই পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। অর্থাৎ, মানুষের জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে এবং সচেতন হলে এই ঝুঁকিগুলোর বড় একটি অংশ এড়ানো সম্ভব। ক্যানসারের এই প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকির সাথে মূলত যে বিষয়গুলো জড়িত রয়েছে, তা হলো:
তামাক ও অ্যালকোহল সেবন: ধূমপান এবং সব ধরনের তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যালকোহল পানের অভ্যাসও ক্যানসারের জন্য দায়ী।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: ফাস্টফুড, প্রসেসড ফুড, অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার এবং শাকসবজি ও ফলমূল কম খাওয়ার প্রবণতা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম না করার ফলে স্থূলতা বা ওজন বৃদ্ধি পায়, যা বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের পথ সুগম করে।
নির্দিষ্ট কিছু সংক্রমণ: হেপাটাইটিস বি এবং সি কিংবা হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV)-এর মতো কিছু নির্দিষ্ট সংক্রমণও ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করে, যার বিরুদ্ধে সময়মতো টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
পাবনা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনসচেতনতা
বিশ্বব্যাপী যখন ক্যানসার নিয়ে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসছে, তখন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও ক্যানসার সচেতনতা বাড়ানো সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো সাধারণ মানুষ ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ উপসর্গগুলোকে অবহেলা করায় শেষ পর্যায়ে গিয়ে রোগ ধরা পড়ে, যা চিকিৎসাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দুরূহ করে তোলে।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বড় বড় হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করলেই চলবে না, বরং তৃণমূল পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
ভবিষ্যৎ করণীয় ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই নতুন প্রতিবেদন বিশ্বনেতৃত্বকে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও জোরালো করার তাগিদ দিয়েছে। তামাকবিরোধী আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ভেজাল খাদ্য রোধে কঠোর নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ক্যানসারের এই ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে ক্যানসার প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার সময় এখনই। ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সরকারের কার্যকর পদক্ষেপে কেবল এই মরণব্যাধির প্রকোপ কমানো সম্ভব নয়, বরং বাঁচানো সম্ভব লাখ লাখ তাজা প্রাণ।