নিউজ ডেস্ক | পাবনা নিউজ ২৪
১৩ জুলাই, ২০২৬
বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দেশের সাতটি জেলায় বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ৫১ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। এছাড়া রাজধানী ঢাকায় টানা বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে চরম জলাবদ্ধতা, যা জনজীবনকে স্থবির করে দিয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি: মানবিক বিপর্যয় ও সংকট
আবহাওয়া অফিস ও বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারী বর্ষণের ফলে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও পাবনার কিছু নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় মানুষজন আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা উঁচু বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন।ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রশাসন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা ও শুকনো খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। তবে দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগ
এদিকে রাজধানী ঢাকার চিত্র একেবারেই ভিন্ন নয়। গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে নগরীর মিরপুর, ধানমন্ডি, বাড্ডা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন নিচু এলাকায় হাঁটু সমান পানি জমে গেছে। নর্দমার ময়লা পানি রাস্তায় উঠে আসায় চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন নগরবাসী। জলাবদ্ধতার কারণে সকাল থেকে প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, যা কর্মজীবী মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ জানিয়েছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, দেশের রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে অধিকাংশ স্থানেই হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হবে। বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে মাঝারি থেকে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এর ফলে শহরের জলাবদ্ধতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেন আমরা সাধারণ মানুষ দুর্যোগের ঝুঁকিতে?
দুর্যোগের পেছনে প্রধান কারণ প্রাকৃতিক হলেও, আমাদের কিছু কিছু অভ্যাস পরিস্থিতির ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিচ্ছে: ১. নদী দখল ও ভরাট: নদী ও খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
২. অপরিকল্পিত নগরায়ণ: পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি তৈরি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
৪. বন উজাড়: বনভূমি ধ্বংসের ফলে মাটির ক্ষয়রোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস বাড়াচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সরকারি পদক্ষেপ
দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ তিনি বরিশালের গৌরনদী উপজেলা সফর করেছেন। সেখানে এক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শেষে তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সাথে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বন্যাকবলিত প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “সরকার প্রান্তিক মানুষের পাশে আছে। আমরা পারিবারিক কার্ড (Family Card) কর্মসূচির পরিধি বাড়াচ্ছি। আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় নিয়ে আসা হবে, যাতে নিম্ন আয়ের মানুষ দুর্যোগের সময়ও খাদ্য সহায়তা পায়।সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সহায়তায় দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। প্রতিটি আক্রান্ত জেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ দ্রুত পৌঁছাতে হবে। কেবল ত্রাণ নয়, নদী ড্রেজিং, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করতে হবে। আবহাওয়া সতর্কবার্তা এবং বন্যা পূর্বাভাস আরও নিখুঁতভাবে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।
আবহাওয়া পূর্বাভাস ও সতর্কতা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ জানিয়েছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে অধিকাংশ স্থানেই হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হবে। বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে মাঝারি থেকে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ ও কৃষি পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। পাবনা নিউজ ২৪-এর পক্ষ থেকে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার এবং আবহাওয়ার সর্বশেষ বুলেটিন নিয়মিত অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।