নিউজ ডেস্ক || পাবনা নিউজ ২৪
৮ জুলাই, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের বিস্ফোরণ ঘটেছে। গত এপ্রিল মাসে হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (MoU) পুরোপুরি ভেঙে দিয়ে দক্ষিণ ইরানে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজে উপর্যুপরি হামলার জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এই শক্তিশালী সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি কেবল ভেস্তেই যায়নি, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এক নতুন এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে।
হামলার নেপথ্য কারণ: হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত
গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz)-তে তিনটি বড় বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা (UKMTO) জানায়, আক্রান্ত জাহাজগুলোর মধ্যে কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) ট্যাঙ্কার এবং সৌদি আরবের পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাঙ্কার রয়েছে। ওমান উপকূলের কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই হামলাগুলো চালানো হয়।মার্কিন প্রশাসন ও তার মিত্রদের দাবি, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এই কাপুরুষোচিত হামলার পেছনে সরাসরি জড়িত। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর হোয়াইট হাউসের নির্দেশে ইরানি আগ্রাসনের কড়া জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
মার্কিন অপারেশন: ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে ‘পাওয়ারফুল স্ট্রাইক’
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, ৭ জুলাই দিবাগত রাতে দক্ষিণ ইরানের কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে চার ঘণ্টাব্যাপী এক ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা একে “টার্নিং আপ দ্য ভলিউম” বা জবাবের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন।মার্কিন হামলায় ধ্বংস হওয়া ইরানি সামরিক সক্ষমতার খতিয়ান: ১. উপকূলীয় রাডার ও নজরদারি ব্যবস্থা (Coastal Surveillance Sites) ২. জাহাজ বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Anti-ship & Air Defense Systems) ৩. আইআরজিসির (IRGC) ৬০টিরও বেশি সশস্ত্র ছোট স্পিডবোট এবং ড্রোন লঞ্চপ্যইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম (IRIB) নিশ্চিত করেছে যে, হরমুজ প্রণালীর প্রবেশদ্বারে অবস্থিত সিরিক (Sirik) শহরে ৭টি, কেশম (Qeshm) দ্বীপে ৬টি এবং ইরানের প্রধান বন্দর নগরী বান্দর আব্বাস (Bandar Abbas)-সহ বেশ কয়েকটি সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় মার্কিন মিসাইল আঘাত হেনেছে। সিরিকের একটি বাণিজ্যিক জেটিতে বিস্ফোরণের ফলে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
শিপিং রুট নিয়ে বিরোধ: ওমান বনাম ইরানি জলসীমা
বর্তমান সংঘাতের মূল কারণ কেবল জাহাজে হামলাই নয়, বরং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও ট্রানজিট ফি নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের আইনি দ্বন্দ্ব।
যুক্তরাষ্ট্র ও ওমানের প্রস্তাব: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখতে ওমান উপকূল ঘেঁষে একটি ‘দক্ষিণী নৌ-করিডোর’ চালুর পক্ষে ওয়াশিংটন।
ইরানের অবস্থান: ইরান চায় সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ যেন তাদের ভূখণ্ডের কাছাকাছি জলসীমা দিয়ে চলাচল করে। একই সাথে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে প্রণালী পারাপার হওয়া সমস্ত জাহাজের ওপর ‘ট্রানজিট ফি’ বা শুল্ক আরোপের দাবি তুলেছে তেহরান। গত জুনের চুক্তিতে ৬০ দিনের জন্য শুল্কমুক্ত যাতায়াতের কথা থাকলেও ইরান জোরপূর্বক নিজেদের রুট ব্যবহারে জাহাজগুলোকে বাধ্য করছিল, যা এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটায়।
ইরানের পাল্টা আঘাত এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
মার্কিন বিমান হামলার পর ইরান চুপ করে থাকেনি। দেশটির সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ড (Khatam al-Anbiya) একে সার্বভৌমত্বের ওপর “নগ্ন আগ্রাসন” বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এর পরপরই আইআরজিসি (IRGC) প্রতিবেশী দেশ বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে পাল্টা হামলা চালায়। কুয়েত ও বাহরাইনে রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতার সাইরেন বাজতে শোনা যায় এবং কুয়েতি সেনাবাহিনী তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে বেশ কিছু ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে। একই সাথে ইরান দক্ষিণ আকাশে একটি মার্কিন MQ-9 reaper ড্রোন গুলি করে নামানোর দাবি করেছে।এদিকে, বৈশ্বিক পরাশক্তি চীন এই ঘটনার পর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই পক্ষকেই “নতুন করে যুদ্ধ বাঁধানো” (Reigniting the war) থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সামরিক শক্তি কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। কাতার এবং সৌদি আরব আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের জাহাজে হামলার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
অর্থনৈতিক ধাক্কা: এই সামরিক সংঘাতের সাথে সাথেই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির অধীনে ইরানকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির যে সাময়িক লাইসেন্স বা ছাড় দিয়েছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (Crude Oil) দাম এক ধাক্কায় আবারও আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উস্কে দিতে পারে।